
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফুলছড়ি রেঞ্জের আওতাধীন চকরিয়া উপজেলার মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যানে সরকারি বনভূমি দখল করে অবৈধভাবে পাকা বাড়ি নির্মাণের হিড়িক পড়েছে। দেশের একমাত্র সুবিশাল মাদার গর্জন গাছ সমৃদ্ধ এই সংরক্ষিত বাগানে অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠার পেছনে স্থানীয় বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশ ও ঘুষ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, নতুন বনবিট কর্মকর্তা মুমিনুর রহমান যোগদানের পর থেকে জাতীয় উদ্যানের ভেতরে বনভূমি জবরদখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এলাকাভিত্তিক নিয়োজিত হেডম্যান ও ভিলেজারদের মাধ্যমে বনকর্মীরা কৌশলে ‘চা-পানির খরচ’ এর নামে টাকা গ্রহণের বিনিময়ে বনভূমিতে এসব বসতি নির্মাণের সুযোগ করে দিচ্ছেন।
সরেজমিনে খুটাখালী মেধাকচ্ছপিয়া বনবিটের অধীন গর্জন সমৃদ্ধ এই বিস্তীর্ণ বনের ভেতরে পাহাড়ের ঢালু কেটে সমতল করে নতুন বসতি গড়ে তুলতে দেখা গেছে। সেখানে ঝুপড়ি ঘরের পাশাপাশি পাকা ও আধাপাকা স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরে এই দখল কার্যক্রম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পরিকল্পিত দখলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, কয়েকটি সংঘবদ্ধ দালাল চক্র নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে জায়গা নির্ধারণ করে দেয়। বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে খরচের টাকা পৌঁছে দিলে বসতি নির্মাণে কোনো বাধা আসে না। এমনকি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি অংশকেও খুটাখালীতে বনভূমিতে বসতি স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে এবং প্রতিটি ঘরের জন্য নির্ধারিত হারে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। সম্প্রতি এই এলাকায় অন্তত ১০ থেকে ১২টি পাকা ও আধাপাকা বসতঘর নির্মাণাধীন রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মেধাকচ্ছপিয়া বনবিট কর্মকর্তা মুমিনুর রহমান বলেন, বনের জমিতে অবৈধ বসতি স্থাপনের সুযোগ দিয়ে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন করা হয়নি। একটি চক্র তার নাম ব্যবহার করে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলে দাবি করে তিনি জানান, সহসাই অবৈধ বসতি নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, বনভূমি দখল করে বসতি স্থাপনে জড়িত আবু তাহের নামের এক ব্যক্তি দাবি করেন, খুটাখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কোনাপাড়া এলাকার আহমদ ছফা এবং রোহিঙ্গা নাগরিক মো. হারেসসহ তাদের তিনটি বসতি নির্মাণের জন্য বন বিভাগের লোকজনকে প্রায় ১৫ হাজার টাকা উৎকোচ হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
চকরিয়া উপজেলা পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মাহমুদ জানান, মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের একমাত্র গর্জনসমৃদ্ধ বাগান, যেখান থেকে সংগৃহীত গর্জন গাছের বীজ বনায়ন সৃজনের জন্য সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। স্থানীয় বনকর্মীদের ঘুষ বাণিজ্যের কারণে আজ এটি জবরদখলের কবলে পড়েছে, যা এই উদ্যানটিকে মারাত্মক পরিবেশগত সংকটে ফেলবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বন বিভাগের ফুলছড়ি রেঞ্জ অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) কুদ্দুসুর রহমান জানান, জাতীয় উদ্যানের জমিতে যেসব অবৈধ স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে বন বিভাগ এরই মধ্যে মামলা রুজু করেছে এবং উচ্ছেদ অভিযান জোরদার করা হচ্ছে।
অবৈধ স্থাপনা তৈরিতে বনকর্মীদের সম্পৃক্ততা ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি সম্পূর্ণ সঠিক নয় বলে দাবি করে তিনি আরও জানান, অপ্রতুল জনবল নিয়েও বন বিভাগের কর্মীরা সবসময় বনভূমির সুরক্ষা নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছেন।