সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

ঈদের আগে-পরে ১৫ দিনে সড়কে ঝরেছে ২৯৮ প্রাণ, শীর্ষে চট্টগ্রাম

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২ এপ্রিল ২০২৬ | ৬:১২ অপরাহ্ন


এবারের পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে ও পরের ১৫ দিনে দেশে ৩৭৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯৮ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে নারী ৪৬ জন এবং শিশু ৬৭ জন। এই সময়ে প্রতিদিন গড়ে ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ‘ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন’-এ এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। আজ বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) গণমাধ্যমে পাঠানো এই প্রতিবেদনে জানানো হয়, ১৪ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ১৫ দিনের সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে সংস্থাটি এই পরিসংখ্যান তৈরি করেছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের ঈদুল ফিতরে ঈদযাত্রায় প্রতিদিন গড়ে ২২ জন নিহত হয়েছিলেন। সে বছর ১১ দিনের ঈদযাত্রায় ২৫৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪৯ জন নিহত হন। প্রতিবেদনে বলা হয়, এবারের ঈদযাত্রায় নিহতদের মধ্যে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১১৬ জন, বাসযাত্রী ৪১ জন, ট্রাক ও পিকআপ আরোহী ১৩ জন, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাস আরোহী ২০ জন, থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক, সিএনজি, অটোরিকশা ও অটোভ্যান) যাত্রী ৫০ জন, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের (নছিমন, ভটভটি, মাহিন্দ্র ও টমটম) যাত্রী ৯ জন এবং বাইসাইকেল আরোহী ২ জন রয়েছেন। সব মিলিয়ে এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ২ হাজারের বেশি মানুষ।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মোট দুর্ঘটনার মধ্যে ১১৫টি বা ৩০.৮৩ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ১৬১টি বা ৪৩.১৬ শতাংশ আঞ্চলিক সড়কে, ৪৮টি বা ১২.৮৬ শতাংশ গ্রামীণ সড়কে, ৪২টি বা ১১.২৬ শতাংশ শহরের সড়কে এবং ৭টি বা ১.৮৭ শতাংশ ফেরিঘাটসহ অন্যান্য স্থানে সংঘটিত হয়েছে। সময়ের হিসেবে দুর্ঘটনার ৬.১৬ শতাংশ ভোরবেলা, ২৪.৩৯ শতাংশ সকালে, ২৩.০৫ শতাংশ দুপুরে, ১৭.৯৬ শতাংশ বিকেলে, ৮.০৪ শতাংশ সন্ধ্যায় এবং ২০.৩৭ শতাংশ রাতে ঘটেছে।

সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। মোট দুর্ঘটনার ২৪.৯৩ শতাংশ এবং প্রাণহানির ২৪.৮৩ শতাংশই এই বিভাগে ঘটেছে। এরপরেই রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে ১৭.৪২ শতাংশ দুর্ঘটনা এবং ২৪.১৬ শতাংশ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এর আগে গত ৩০ মার্চ বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, এবারের ঈদুল ফিতরে দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৮৮ জন আহত হন। এর মধ্যে শুধু সড়কেই ৩৪৬টি দুর্ঘটনায় ৩৫১ জনের মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়েছিল।

সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে ১০টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। কারণগুলো হলো: ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা, বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণ-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা ও তা না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।

সংস্থাটি মনে করে, নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে কমপক্ষে তিন বছর মেয়াদি একটি টেকসই ও সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা প্রয়োজন। রেলপথ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো, নৌপরিবহন উন্নত করা এবং বিআরটিসির রুট বিস্তৃত করে বাসের সংখ্যা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, পোশাকশ্রমিকেরা যাতে পর্যায়ক্রমে ছুটি কাটাতে পারেন এবং তাদের জন্য অঞ্চলভিত্তিক যানবাহনের ব্যবস্থা থাকে, সেই পরিকল্পনা গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই নিরাপদ সড়কব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এর জন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা রোধে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ১২টি সুপারিশ তুলে ধরেছে। প্রথমত, জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন করে এর অধীনে বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএ পরিচালনা করা এবং কাউন্সিলের হাতে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া। দ্বিতীয়ত, এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং শীর্ষ পদে বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দেওয়া। তৃতীয়ত, মোটরযানে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা। চতুর্থত, সড়ক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার করা। পঞ্চমত, রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে আধুনিক বাস সার্ভিস চালু করা। ষষ্ঠত, বিআরটিসির বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। সপ্তমত, দক্ষ চালক তৈরি করে তাঁদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। অষ্টমত, ছোট যানবাহনের জন্য সার্ভিস রোড নির্মাণ করা। নবমত, সব রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ করা। দশমত, সচেতনতা বাড়াতে বাজেটে অর্থ বরাদ্দ করা। একাদশত, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি করা। এবং দ্বাদশত, একটি অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠন করা।