
গত ১৯ দিনে দেশজুড়ে হামের সন্দেহভাজন ৯৪ জনের মৃত্যু এবং ৫ হাজার ৭৯২ জন আক্রান্ত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে সরকার। এতে বোঝা যাচ্ছে, হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত মাত্র ৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামের কারণে হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। চলতি বছর, বিশেষ করে মার্চ মাস থেকে এই অতি সংক্রামক রোগের মারাত্মক বিস্তার দেখা যাচ্ছে।
হামের এই বিস্তারে জনস্বাস্থ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে আগামীকাল থেকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। হাসপাতালগুলোতে মারা যাওয়া বেশির ভাগ শিশুই টিকা পায়নি। স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে দীর্ঘ বিরতি, নিয়মিত টিকাদানে বারবার বিঘ্ন ঘটা এবং টিকার সরবরাহ সংকটের কারণে তৈরি হওয়া ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতিই এই বিস্তারের প্রধান কারণ।
অতি সংক্রামক এই রোগের কারণে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ এবং এনসেফালাইটিসের মতো জটিলতা দেখা দেয়। এটি রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও কমিয়ে দেয়, যা শিশু ও অন্যান্য রোগে আক্রান্তদের বেশি ঝুঁকিতে ফেলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২৮ মার্চ পর্যন্ত দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে অন্তত ৫৬টিতে হামের রোগী পাওয়া গেছে। তবে কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এরপর আরও আটটি জেলায় এই রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশোধিত তথ্য
গত বৃহস্পতিবার থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিজেদের ওয়েবসাইটে হামের তথ্য প্রকাশ শুরু করে। তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদনে ১৫ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ৩ হাজার ৭০৯ জন সন্দেহভাজন রোগী এবং এর মধ্যে ৫৮৫ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হওয়ার কথা জানানো হয়। পাশাপাশি ২৭ জনের মৃত্যু এবং এর মধ্যে ১৩ জন নিশ্চিতভাবে হামে মারা যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাদের তথ্য সংশোধন করেছে। আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে তিনজনের মৃত্যু এবং ৯৪৭ জন সন্দেহভাজন রোগীর কথা জানানো হয়েছে। এদিকে নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা ১৩ থেকে কমিয়ে ৯ করা হয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, জেলা পর্যায়ের ভুল রিপোর্টিংয়ের কারণে পাঁচটি মৃত্যু বাদ দেওয়া হয়েছে এবং আগে বাদ পড়া একটি মৃত্যু তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। অধিদপ্তরের এমআইএস শাখার একজন কর্মকর্তা জানান, মারা যাওয়াদের বেশির ভাগই শিশু।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ৫ হাজার ৭৯২ জন সন্দেহভাজন রোগীর মধ্যে ১৫ মার্চ থেকে ৩ হাজার ৭৭৬ জনকে ভর্তি করা হয়েছে এবং ২ হাজার ৫২৭ জনকে এরই মধ্যে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৩৯৪ জন সন্দেহভাজন রোগী পাওয়া গেছে। এরপর রাজশাহীতে ১ হাজার ২৪৩ জন এবং চট্টগ্রামে ৭১৭ জন। সবচেয়ে কম ১১৯ জন রোগী মিলেছে রংপুরে।
সরকার এর আগে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুর এত বড় সংখ্যা প্রকাশ করেনি। গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলা প্রায় এক ডজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তাও এত মৃত্যুর ইঙ্গিত দেননি। বেশির ভাগ সংবাদপত্রই মৃতের সংখ্যা ৫০ থেকে ৬৫ জনের মধ্যে বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।
পরিস্থিতি এত ভয়াবহ কেন?
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য বলছে, গত দুই বছরে নিয়মিত কর্মসূচির আওতায় সাধারণ টিকাদানের হার কমেছে। বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনতে প্রতি চার বছর অন্তর বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন করা হয়। সর্বশেষ ক্যাম্পেইন হয়েছিল ২০২০ সালে। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনজনিত পরিস্থিতির কারণে ২০২৪ সালের নির্ধারিত ক্যাম্পেইনটি পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন ইপিআইয়ের উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ। এ ছাড়া গত বছর গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্য সহকারীদের ধর্মঘটের কারণে অন্তত তিনবার নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়।
স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) স্থগিতাদেশের পর অর্থায়ন সংকট পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। ১৯৯৮ সাল থেকে চারটি এইচপিএনএসপি বাস্তবায়িত হয়েছে, যার সর্বশেষটির মেয়াদ শেষ হয় ২০২৪ সালের জুনে। অন্তর্বর্তী সরকার গত মার্চে প্রস্তাবিত পঞ্চম কর্মসূচিটি বাতিল করে খাতভিত্তিক কর্মসূচিগুলোকে নিয়মিত কর্মসূচির সঙ্গে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেয়। অসমাপ্ত কাজ চালিয়ে নিতে এবং ওষুধ ও টিকার সরবরাহ নিশ্চিতে পরে কিছু প্রকল্প অনুমোদন করা হলেও এগুলোতে অনেক দেরি হয়, কোনো কোনোটির ক্ষেত্রে গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
গত বছরের আগস্টে টিকা কেনার জন্য ৮৪২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তবে ইউনিসেফের সরাসরি ক্রয়পদ্ধতির মাধ্যমে অর্ধেক এবং দরপত্রের মাধ্যমে বাকি অর্ধেক সংগ্রহের সিদ্ধান্তের কারণে জটিলতা দেখা দেয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, জটিলতার কারণে এখনো টিকা কেনা সম্ভব হয়নি, যার ফলে গত জানুয়ারি থেকে রেশনিং করতে হচ্ছে। সদর দপ্তরে হামসহ ছয়টি টিকার মজুত শেষ হয়ে গেছে এবং মাঠপর্যায়েও সংকট রয়েছে। এ বিষয়ে তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইপিআইয়ের শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, নিয়মিত হামের টিকার কেন্দ্রীয় মজুত শেষ হয়ে গেলেও আগামী মধ্য এপ্রিলের বিশেষ ক্যাম্পেইনের জন্য গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনস (গ্যাভি) থেকে ২ কোটি ডোজ টিকা পাওয়া গেছে। তবে সিরিঞ্জসহ অন্যান্য লজিস্টিক সংকটের কারণে এই ক্যাম্পেইন জুন বা জুলাই পর্যন্ত পিছিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরও জানান, সিরিঞ্জের ব্যবস্থা হওয়ায় আগামীকাল থেকে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক হালিমুর রশিদ জানান, জরুরি ক্যাম্পেইনটি প্রাথমিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে দুই সপ্তাহ ধরে চলবে এবং পরে এর মেয়াদ বাড়তে পারে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে বিস্তারিত চূড়ান্ত করতে আজ রাতে একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
নতুন করে আরও ৫ মৃত্যু
জেলা পর্যায়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রাদুর্ভাবে প্রাণহানি বেড়েই চলেছে। কক্সবাজার সদর হাসপাতালে বৃহস্পতিবার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় হামের মতো উপসর্গে চারজনের মৃত্যু হলো। মারা যাওয়া দুই শিশু হলো রামুর সাত মাস বয়সী রৌশনী এবং মহেশখালীর ৯ মাস বয়সী জেসিন। ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন মহিউদ্দীন আলমগীর জানান, পরীক্ষার জন্য ৯২টি নমুনা পাঠানো হয়েছিল, যার মধ্যে এখন পর্যন্ত ৩০টির ফলাফল পজিটিভ এসেছে।
টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে গতকাল ১৩ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং গত বৃহস্পতিবার জেলায় আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হামের মতো উপসর্গ নিয়ে এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ২৯ মার্চ থেকে সেখানে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ছয়জনে দাঁড়াল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মারা যাওয়া রোগীর পরিচয় প্রকাশ করেনি। রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, গতকাল দুপুর পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১২ জন সন্দেহভাজন রোগী ভর্তি হয়েছেন এবং ১৩ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগের ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহভাজন এক হাম রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে সেখানে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ছয়জনে পৌঁছাল।