
দেশে ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আর এই ঋণখেলাপির শীর্ষে রয়েছে মাত্র ২০টি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান আবার সাতটি নির্দিষ্ট শিল্পগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। শীর্ষস্থানীয় এই ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশের মালিক বর্তমানে আত্মগোপনে বা কারাগারে রয়েছেন। এ ছাড়া বর্তমান সংসদের কয়েকজন সংসদ সদস্যের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণের একটি বড় অংশও খেলাপি অবস্থায় রয়েছে।
গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী খেলাপি ঋণের এসব তথ্য জানিয়েছেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে এনসিপির সংসদ সদস্য আবুল হাসনাতের (হাসনাত আবদুল্লাহ) এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব তথ্য জানান। অর্থমন্ত্রী সংসদকে জানান, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে বর্তমান কয়েকজন সংসদ সদস্যের প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। অর্থমন্ত্রী শীর্ষস্থানীয় ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের নামও সংসদে তুলে ধরেন, যার মধ্যে ১১টিই এস আলম গ্রুপের।
সংসদে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া শীর্ষস্থানীয় ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এই ২০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১টিই চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের। ভোজ্যতেল, চিনি, ইস্পাত, ট্রেডিংসহ বিভিন্ন খাতের এসব প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছে গ্রুপটি, যার বড় অংশই এখন খেলাপি। তালিকায় শীর্ষে থাকা অন্যান্য বড় শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপ, কেয়া গ্রুপ, দেশবন্ধু গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, মাইশা গ্রুপ এবং রংধনু গ্রুপ।
সংসদে দেওয়া তালিকা অনুযায়ী এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল, এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ, এস আলম কোল্ড রোলড স্টিলস, সোনালী ট্রেডার্স, গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন, চেমন ইস্পাত, এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি, ইনফিনিট সিআর স্ট্রিপস এবং এস আলমের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান মুরাদ এন্টারপ্রাইজ ও কর্ণফুলী ফুডস (প্রা.) লিমিটেড।
তালিকায় থাকা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপের বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইম্পোর্ট কোম্পানি ও বেক্সিমকো কমিউনিকেশনস, কেয়া গ্রুপের কেয়া কসমেটিকস, দেশবন্ধু গ্রুপের দেশবন্ধু সুগার মিলস এবং সিকদার গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্র পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট ও পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট।
বিএনপি সরকারের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খানের মালিকানাধীন প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেডও শীর্ষস্থানীয় খেলাপিদের মধ্যে রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের সিটিসেল টেলিকম দেশের প্রথম মোবাইল অপারেটর, যা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘদিন স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকার পর বর্তমানে দেশেই রয়েছেন মোরশেদ খান। সূত্র জানায়, বেক্সিমকো গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ সোহেল ফসিহুর রহমানের সঙ্গে ২০২০ সালের মে মাসে একটি চার্টার্ড উড়োজাহাজে করে সস্ত্রীক দেশ ছেড়েছিলেন তিনি। তখন মোরশেদ খানের বিরুদ্ধে একটি দুর্নীতির তদন্ত চলছিল।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সপরিবার বিদেশে পলাতক রয়েছেন এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম। গণ-অভ্যুত্থানের পর গ্রেপ্তার হয়ে বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান বিভিন্ন মামলায় কারাগারে রয়েছেন। তিনি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশ ছেড়েছেন সিকদার পরিবারের সদস্যরাও।
শীর্ষস্থানীয় ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় থাকা সিএলসি পাওয়ার কোম্পানির মালিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রয়াত সংসদ সদস্য আসলামুল হক। তিনি মাইশা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০২১ সালে আসলামুল হকের মৃত্যুর পর তাঁর অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমান সংসদ সদস্যদের কয়েকজনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণের তথ্যও দেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সংসদে প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বর্তমান সংসদ সদস্য এবং তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মোট ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত। তবে তিনি উল্লেখ করেন, আদালতের স্থগিতাদেশ বা নির্দেশনার কারণে এই খেলাপি ঋণের একটি অংশ নিয়মিত হিসেবে প্রদর্শিত হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্রমতে, শীর্ষস্থানীয় ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই হলো রাষ্ট্রায়ত্ত ৬টি ব্যাংক ও বেসরকারি ইসলামী ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা। এগুলোর মধ্যে শুধু এস আলম গ্রুপের খেলাপি ঋণই দাঁড়িয়েছে ৯৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। রাষ্ট্রায়ত্তসহ মোট ৬টি ব্যাংক থেকে এসব ঋণ নেওয়া হয়েছে, যার ৭৯ শতাংশই নেওয়া হয়েছে বেসরকারি ইসলামী ব্যাংক থেকে। এর বাইরে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক থেকেও ঋণ নিয়েছে এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো।
এস আলম রিফাইন্ড সুগার, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল, এস আলম ট্রেডিং ও গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশনের বড় ঋণদাতা রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। এই ব্যাংকের শুধু একটি শাখা থেকেই ঋণ নেওয়া হয়েছে ১০ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা, যার পুরোটাই এখন খেলাপি। এস আলম কোল্ড রোলড স্টিলস, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল ও পাওয়ার স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানি ২০ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে ইসলামী ব্যাংক থেকে।
কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ ঋণখেলাপির ঝুঁকিতে রয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠানের ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দীর্ঘমেয়াদি এবং ৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকা স্বল্পমেয়াদি ঋণ রয়েছে, যার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ খেলাপি। প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড দেশের প্রথম মোবাইল অপারেটর কোম্পানি হলেও প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। এখন ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় পুরো ঋণই অনাদায়ী বলে জানা গেছে।
খেলাপি ঋণ কমাতে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও সংসদে তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী। নিয়মিত ব্যাংকার্স সভায় শীর্ষ খেলাপিদের অগ্রগতি পর্যালোচনা, সমস্যাগুলো শনাক্ত করে ব্যাংকভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকের জন্য বিশেষ রেজল্যুশন কৌশল নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ইচ্ছাকৃত খেলাপি শনাক্তে নীতিমালা, আইন বিভাগ শক্তিশালীকরণ এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। চলতি বছরের জুনের মধ্যে অন্তত ১ শতাংশ নগদ আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নীতিগত সংস্কারের দিকেও জোর দিচ্ছে সরকার। ব্যাংক কোম্পানি আইন, অর্থঋণ আদালত আইন, দেউলিয়া আইনসহ বিভিন্ন আইনে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ঋণের ঝুঁকি নিরূপণ, প্রভিশনিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং জামানত মূল্যায়নে স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।