সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

দ্বিগুণ দামে এলএনজি কিনেও মিটছে না গ্যাস সংকট, অলস বসে আছে অর্ধেক বিদ্যুৎকেন্দ্র

গ্যাস সংকটে বসে আছে ৭ হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাড়ছে ভর্তুকি ও লোডশেডিং
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:২২ পূর্বাহ্ন


বৈশ্বিক সংকটের প্রবল ঢেউ আছড়ে পড়েছে দেশের জ্বালানি খাতে। গ্যাস সরবরাহ সচল রাখতে দ্বিগুণ দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনলেও মেটানো যাচ্ছে না বিশাল চাহিদা। জ্বালানির এই তীব্র হাহাকারে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা এখন অলস পড়ে আছে। দোসর হিসেবে যুক্ত হয়েছে কয়লা সংকট। সব মিলিয়ে দেশজুড়ে বাড়ছে লোডশেডিংয়ের দাপট, বিঘ্নিত হচ্ছে প্রাত্যহিক জীবন।

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সুবাদে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল কাতার ও ওমান। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা বাজতেই যেন সেই ভরসার প্রদীপ নিভে গেছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সূত্রমতে, এই দুই দেশের সঙ্গে চারটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকলেও আগামী মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে তারা। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই অন্ধকারের স্থায়িত্ব আরও বাড়ার শঙ্কা প্রকট হচ্ছে।

গ্যাসের এই হাহাকার এক দিনের নয়, গত কয়েক বছর ধরেই ধুঁকছে দেশ। বর্তমানে দেশি গ্যাসক্ষেত্র থেকে দিনে মাত্র ১৭০ কোটি ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে ৯৫ কোটি ঘনফুট মিলিয়ে মোট ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। অথচ প্রতিদিনের তৃষ্ণা ৩৮০ কোটি ঘনফুটের! এই বিপুল ঘাটতির সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে এক খাতের গ্যাস কেটে অন্য খাতে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে সার কারখানার চাকা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে স্রেফ গ্যাসের অভাবে।

বাংলাদেশ তৈল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) জানিয়েছে, দিনে সর্বোচ্চ ১১০ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে তাদের। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য মাসে ১১টি এলএনজি কার্গো বা জাহাজের প্রয়োজন। চলতি মাসে ৯টি কার্গো দেশে ভেড়ার কথা। এর মধ্যে খোলাবাজার থেকে ৮টি কার্গো কেনা হয়েছে চড়া দামে। পাশাপাশি কাতারের সঙ্গে দ্বিতীয় চুক্তির আওতায় অ্যাঙ্গোলা থেকে একটি কার্গো আসার অপেক্ষায়। সব মিলিয়ে দিনে এলএনজি থেকে গড়ে ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস হয়তো পাওয়া যাবে।

সার্বিক এই সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এখন শিল্প ও কৃষি উৎপাদন সচল রাখা। বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ বাড়াতে গিয়ে কোনোভাবেই শিল্পের গ্যাস কমানো যাবে না। তাই যেকোনো মূল্যে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদন এবং মানুষের জ্বালানি সাশ্রয়ী মনোভাবই পারে লোডশেডিংয়ের এই বিভীষিকা থেকে মুক্তি দিতে।

আসছে জাহাজ, লাফিয়ে বাড়ছে ভর্তুকির পাহাড়

পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, এপ্রিলে ইতিমধ্যে দুটি এলএনজি জাহাজ দেশের জলসীমায় নোঙর করে খালাস শুরু করেছে। ৪ ও ৫ এপ্রিল আসা এই দুটি জাহাজের পর ১০, ১১, ১৫, ১৮, ২১, ২৪ ও ২৭ এপ্রিল আরও সাতটি জাহাজ আসার কথা। আগামী মাসে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আরও ১১টি কার্গো আনার ছক কষেছে সরকার। এর মধ্যে দুটি কার্গো কেনার প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে, আরও তিনটির জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে যা ৮ এপ্রিল উন্মুক্ত হবে।

তবে পর্দার পেছনের গল্পটা আরও ভয়াবহ। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধ শুরুর আগে যে এলএনজি প্রতি ইউনিট মাত্র ১০ ডলারে মিলত, এপ্রিলে তা কিনতে গড়ে ২০ ডলারের বেশি গুনতে হয়েছে। একটি কার্গো তো রেকর্ড ২৮ দশমিক ২৮ ডলারেও কেনা হয়েছে! এর ফলে পেট্রোবাংলার লোকসানের খাতা কেবল দীর্ঘই হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে গ্যাস খাতে ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দের মধ্যে প্রথম ৯ মাসেই সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ফুরিয়েছে। আর শুধু এপ্রিলেই নতুন করে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দাবি করেছে পেট্রোবাংলা! অর্থাৎ বরাদ্দের চেয়ে ইতিমধ্যেই তিন হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ হয়ে গেছে। আগামী দুই মাসে এই অঙ্ক আরও ৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। এর সঙ্গে ডলার সংকটের চাপ তো রয়েছেই।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক সংবাদমাধ্যমকে জানান, দাম যত চড়াই হোক না কেন, সরকারি নির্দেশনায় গ্যাস সরবরাহ ধরে রাখতে এলএনজি কেনা হচ্ছে। আগামী মাসের জন্যও একই পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে পেট্রোবাংলা।

অলস বসে বিদ্যুৎকেন্দ্র, লোডশেডিংয়ের খড়্গ সাধারণের ঘাড়ে

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বলছে, গ্রীষ্মের এই তীব্র গরমে লোডশেডিংমুক্ত থাকতে হলে দিনে ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। অথচ গতকাল মিলেছে মাত্র ৯১ কোটি ঘনফুট! ফলে ১২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও উৎপাদন হচ্ছে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, ৭ হাজার মেগাওয়াটের বিশাল সক্ষমতা স্রেফ অলস বসে আছে। আর এই অলস কেন্দ্রগুলোর জন্যই সরকারকে গুনতে হচ্ছে কোটি কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ বা ভাড়া। গ্যাস সরবরাহের কোনো টেকসই উৎস নিশ্চিত না করেই গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই কেন্দ্রগুলো নির্মাণের মাশুল গুনছে এখন পুরো দেশ।

পিডিবির কর্মকর্তাদের মতে, পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে কয়লা ও কারিগরি সংকট। কয়লার অভাবে দুটি কেন্দ্র থেকে চাহিদামতো বিদ্যুৎ মিলছে না, আদানির কেন্দ্র থেকে আসছে অর্ধেক সরবরাহ। অন্যদিকে, তেলচালিত কেন্দ্রগুলো পুরোদমে চালালে ভর্তুকির চাপ সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়বে, তার ওপর রয়েছে বকেয়া বিলের চাপ। তাই বাধ্য হয়েই লোডশেডিংয়ের অস্ত্র বেছে নিতে হয়েছে। ইতিমধ্যেই বিদ্যুতের চাহিদা ১৫ হাজার মেগাওয়াট ছুঁয়েছে, ফলে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। এই চাহিদা সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। তাই লোডশেডিং সহনীয় মাত্রায় রাখতে সন্ধ্যার পর দোকান ও বিপণিবিতান বন্ধ রেখে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা চলছে।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট ভূতত্ত্ববিদ বদরুল ইমাম বলেন, জ্বালানি ছাড়া একটি দেশের অস্তিত্ব অকল্পনীয়। সাময়িক এই সংকট মেটাতে এলএনজি কেনা এবং সাশ্রয়ী হওয়ার বিকল্প নেই। তবে দিনের পর দিন এমন আমদানিনির্ভর থাকলে এই ঝুঁকি বারবার ফিরে আসবে। তাই নিজস্ব জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে সরকারকে এখনই সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে।