
পারস্য উপসাগরের বুকে দীর্ঘ ৩৯ দিনের উৎকণ্ঠা আর দমবন্ধ করা প্রতীক্ষার অবশেষে অবসান ঘটল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দুই সপ্তাহের কাঙ্ক্ষিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির সুবাদে আবারও নোঙর তুলেছে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। ৩৭ হাজার টন সার বুকে নিয়ে সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে সমুদ্রের বুক চিরে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) এই বিশালাকায় জলযান।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতেই বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে ফিরেছে পুরোনো প্রাণচাঞ্চল্য। পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা প্রায় ৮০০ জাহাজের এক বিশাল বহর থেকে প্রথম দফায়ই ছাড়পত্র আদায় করে নিয়েছে ‘বাংলার জয়যাত্রা’।
মেরিটাইম ট্র্যাকিং ডেটাবেজ ভেসেল ফাইন্ডার জানাচ্ছে, ফরাসি জাহাজ ‘এমভি ক্রাইবি’ প্রথম হরমুজ পার হলেও, অপেক্ষমাণ শত শত জাহাজের মধ্যে প্রথম ২০ থেকে ৩০টির গর্বিত তালিকাতেই রয়েছে বাংলাদেশের নামটি। সব ঠিক থাকলে বৃহস্পতিবার দিবাগত মধ্যরাতেই হরমুজ প্রণালির রোমাঞ্চকর পথটুকু পাড়ি দেবে জাহাজটি, যা হবে যুদ্ধবিরতির পর কোনো বাংলাদেশি জাহাজের প্রথম হরমুজ অতিক্রম!
জাহাজে থাকা ৩১ জন অকুতোভয় বাংলাদেশি নাবিক ও ক্রু সম্পূর্ণ সুস্থ ও নিরাপদে আছেন। এই যাত্রায় জাহাজটির নেতৃত্বে রয়েছেন ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম চৌধুরী। বুধবার এক বার্তায় তিনি জানান, সকাল সাড়ে আটটায় তাঁরা হরমুজ প্রণালির উদ্দেশে নোঙর তুলেছেন। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে এই প্রণালি পাড়ি দিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরে বাংকারিং শেষে তাঁদের চূড়ান্ত গন্তব্য হবে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন বন্দর।
অন্যদিকে, জাহাজের বর্তমান পরিস্থিতির এক নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন প্রধান প্রকৌশলী রাশেদুল হাসান। তিনি জানান, বিএসসির সবুজ সংকেত পাওয়ার পর থেকেই তাঁরা পুরোদমে যাত্রা শুরু করেছেন। জাহাজটি বর্তমানে হরমুজ প্রণালি থেকে প্রায় ৪২০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থান করছে। তাঁরা ঘণ্টায় ১২ নটিক্যাল মাইল মসৃণ গতিতে লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছেন এবং এই গতি অব্যাহত থাকলে ৪০ ঘণ্টার মধ্যেই তাঁরা প্রণালিটি সফলভাবে অতিক্রম করতে পারবেন।
এক মাসেরও বেশি সময় অলস বসে থাকলেও এই যাত্রায় বিস্ময়করভাবে কোনো আর্থিক ক্ষতির মুখেই পড়তে হচ্ছে না বাংলাদেশকে! বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক এই খবরটি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, জাহাজটি আটকে থাকার দিনগুলোতেও চার্টারারদের কাছ থেকে প্রতিদিন ২০ হাজার ডলার করে ভাড়া পাবে বিএসসি। যুদ্ধের ওই উত্তেজনাকর দিনগুলোতেও জাহাজে ছয় মাসের পর্যাপ্ত খাবার, পানি ও জ্বালানি মজুত ছিল। নাবিকেরা নিয়মিত তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছেন। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিএসসি প্রতিনিয়ত নাবিকদের মনোবল ধরে রাখতে তাঁদের পাশে থেকেছে।
এখন যেহেতু হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং জাহাজ চলাচলে ইরানের কোনো আপত্তি নেই, তাই কমোডর মাহমুদুল মালেক দৃঢ়ভাবে আশা করছেন আন্তর্জাতিক বিমার ছাড়পত্র নিয়েই জাহাজটি নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে তার গন্তব্যে পৌঁছাবে।
দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মেঘ কাটিয়ে ‘বাংলার জয়যাত্রা’ যেন এক নতুন বিজয়ের আখ্যান লিখতেই ফের সমুদ্রে ডানা মেলেছে!