সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

স্বাস্থ্যকেন্দ্র নয়, যেন পরিত্যক্ত কোনো ধ্বংসাবশেষ

পটিয়ার ধলঘাট স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বেহাল দশা
রবিউল হোসেন | প্রকাশিতঃ ১০ এপ্রিল ২০২৬ | ১০:৩১ পূর্বাহ্ন


দেয়ালের পলেস্তারা খসে বেরিয়ে এসেছে ভেতরের লাল ইট। শেওলা ধরা পুরোনো আমলের বড় বড় কংক্রিটের পিলারগুলো কালের করুণ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিবর্ণ ও জরাজীর্ণ কাঠের দরজাগুলো দেখলেই মনে হয় যেন যুগ যুগ ধরে পরিত্যক্ত কোনো জমিদার বাড়ি বা প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটি একটি চিকিৎসাকেন্দ্র। অথচ পটিয়া উপজেলার ধলঘাট ইউনিয়নের অর্ধলক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসাস্থল এই ধলঘাট ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ক্যাম্প বাজারের পাশে এলাকার সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার মহৎ উদ্দেশ্যে এটি স্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অযত্ন আর অবহেলায় ভবনটি ব্যবহারের একেবারে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। দরজা-জানালা ভেঙে যাওয়ায় এবং ছাদের করুণ দশার কারণে বর্ষায় পানি পড়ে আর শুষ্ক মৌসুমে সরাসরি রোদ এসে ঢোকে। এতসব প্রতিকূলতার মধ্যেই একটি জরাজীর্ণ কক্ষে বাধ্য হয়ে কোনো রকমে চলছে নামমাত্র স্বাস্থ্যসেবার কার্যক্রম।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটির একটি কক্ষ ছাড়া বাকি সবগুলোই পুরোপুরি অরক্ষিত। ভাঙা দরজা-জানালার সুযোগ নিয়ে দিনের বেলায় এটি যেমন ভুতুড়ে রূপ ধারণ করে, রাত হলে এর চিত্র হয়ে ওঠে আরও ভয়ংকর। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাত নামলেই অরক্ষিত এই জরাজীর্ণ কক্ষগুলোতে নিয়মিত বসে মাদকের আসর। মাঝে মাঝে প্রশাসন অভিযান চালালে কয়েকদিন পরিস্থিতি শান্ত থাকে ঠিকই, কিন্তু কিছুদিন পর আবার আগের রূপে ফিরে যায় মাদক চক্রের এই আস্তানা।

এমন করুণ পরিস্থিতিতে স্থানীয় মানুষদের ভোগান্তির যেন শেষ নেই। চিকিৎসাসেবার বেহাল দশা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল ইসলাম আক্ষেপ করে জানান, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক নিয়মিত আসেন না, শুধু একজন স্বাস্থ্য সহকারী নির্দিষ্ট সময়ে এসে দায়সারাভাবে দায়িত্ব পালন করে চলে যান। আরেক বাসিন্দা বাপ্পী সরকারও একই সুরে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, দেয়াল খসে পড়া এই ভবনে চিকিৎসা নেওয়ার মতো ন্যূনতম কোনো পরিবেশ অবশিষ্ট নেই, বাধ্য হয়ে জরুরি চিকিৎসার জন্য এলাকার মানুষকে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে পটিয়া সদরে ছুটতে হয়।

সরকারি নথিপত্রেও এই ভবনের করুণ দশার প্রমাণ মেলে। ২০১৫ সালেই স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এই ভবনটিকে ব্যবহারের অনুপযোগী বা পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছিল। এ বিষয়ে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সাজ্জাদ হোসাইন জানান, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ার কারণে সেখানে বসে চিকিৎসা দেওয়ার মতো কোনো পরিবেশ নেই। তারপরও বাধ্য হয়ে দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে কর্মরত চিকিৎসক সপ্তাহে অন্তত দুই দিন সেখানে গিয়ে রোগীদের সময় দেন।

অন্যদিকে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আবু তৈয়ব এই জরাজীর্ণ ভবনের নতুন সম্ভাবনার কথা শুনিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, জরুরি ভিত্তিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পুনর্নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ফাইল পাঠানো হয়েছিল এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য প্রকল্প অনুমোদন হওয়ার পর টেন্ডার প্রক্রিয়াও ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতেই নতুন ভবনের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু মার্চ মাস শেষ হয়ে গেলেও অজানা কারণে এখনো কাজ শুরু করা যায়নি।