
বিগত ১৬ বছরে ফ্যাসিবাদী সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের কারণে অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাত অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলেও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী উল্লেখ করেন।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে হুন্ডি প্রবাহ এবং অর্থ পাচারের কারণে রিজার্ভের পরিমাণ কমে ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও আমদানি প্রবৃদ্ধি কমে এসেছে এবং রেমিট্যান্স বা প্রবাস আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান।
আজ শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৩তম দিনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব কথা বলেন। ১৩তম দিনে এই সংসদের সভাপতিত্ব করছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সর্বশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল মেয়াদে তাঁরা এ দায়িত্ব পালন করেছেন। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতে বিশ্বাস করে এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দেশের উন্নয়নে কাজ করে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও বলেন, এ দায়বদ্ধতা থেকে তিনি আজ এই মহান সংসদের মাধ্যমে তাঁদের সর্বশেষ অর্থবছর ২০০৫-০৬, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছর এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক, সামাজিক খাতের সূচক এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থার একটা চিত্র দেশবাসীকে অবহিত করতে পারেন। পাশাপাশি, জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে একটি উন্নত, মর্যাদাশীল ও বৈষম্যহীন মানবিক রাষ্ট্র গঠনে তাঁদের প্রতিশ্রুত দর্শন ও নীতি কৌশলের বিষয়েও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশবাসীকে অবহিত করতে চান।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, প্রথমেই তিনি বিগত সরকারের আমলে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকসমূহের বাস্তব চিত্র স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের মাধ্যমে দেশবাসীকে জানাতে চান। উক্ত সময়কালে অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি পেলেও এর ভেতরে বেশ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে ওঠে বলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে স্থির মূল্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ছিল তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে, অর্থাৎ ৭.১৭ শতাংশে। পরবর্তী সময়ে অর্থনীতির আকার বাড়লেও দুর্বৃত্তায়ন ও ভ্রান্ত নীতির কারণে ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে প্রবৃদ্ধির হার কমে ৪.২২ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৯.৭৩ শতাংশে পৌঁছায়। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও জানান, ২০০৫-০৬ সালে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.৬৬ শতাংশ, ২০২৩-২৪ সালে সেটা নেমে এসেছে মাত্র ৩.৫১ শতাংশে। কৃষিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.৭৭ শতাংশ, তা ২০২৩-২৪ সালে কমে হয়েছে ৩.৩০ শতাংশ।
দেশের কর্মসংস্থানের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, একটি অর্থনীতি যখন শিল্পের চালিকাশক্তি হারিয়ে ফেলে, তখন কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। বিগত সময়ে এটি চরমভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বিগত এক দশকে দেশের অর্থনীতির প্রধান তিনটি খাতের মধ্যে কৃষিখাতে মূল্য সংযোজনের অংশ কমেছে প্রায় ৪ শতাংশ, অন্যদিকে শিল্প ও সেবা খাতের অবদান বেড়েছে। কিন্তু এই সময়ে কৃষিখাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৪.৮ শতাংশ, আর শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান কমেছে। শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় তরুণেরা বাধ্য হয়ে কৃষি খাতেই বেশি করে নিয়োজিত হয়েছেন। এতে করে ছদ্ম বেকারত্ব তীব্রতর হয়েছে এবং তরুণদের শ্রমশক্তি অপচয় হয়ে তাঁদের উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে সীমিত করছে। বর্তমানে কৃষিখাত মোট জাতীয় মূল্য সংযোজনের মাত্র ১১.৬ শতাংশ যোগ করলেও মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪১ শতাংশ এই খাতে নিয়োজিত।
এই বৈপরীত্য কৃষিখাতে শ্রমের নিম্ন উৎপাদনশীলতাকে ইঙ্গিত করে ও শ্রমবাজারের গভীর কাঠামোগত দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে এবং এটি কর্মসৃজনবিহীন প্রবৃদ্ধিরই ঝুঁকির পরিচায়ক বলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন।