
কক্সবাজার উপকূলে মাছ ধরার ট্রলার চলাচল ক্রমেই স্থবির হয়ে পড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে হাজারো জেলের জীবন-জীবিকায়। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের কারণে অধিকাংশ ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাগরে জলদস্যুদের বাড়তি তৎপরতা, ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। একই সময়ে সাগরে মাছের অপ্রতুলতাও জেলেদের নিরুৎসাহিত করছে। এরই মধ্যে আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে কার্যকর হতে যাওয়া ৫৮ দিনের মৎস্য আহরণ নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তুলছে। ফলে কক্সবাজার উপকূলজুড়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা ও আর্থিক চাপের অশনিসংকেত।
কক্সবাজার জেলা ফিশিং বোট মালিকদের তথ্য বলছে, কক্সবাজারে নিবন্ধিত মাছ ধরার ট্রলারের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার ২৫০। এর মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৩০ শতাংশ সাগরে যেতে পারছে। বাকি প্রায় ৭০ শতাংশ ট্রলার নোঙর করে ঘাটে পড়ে আছে। আগে থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারা কিছু ট্রলার সীমিতভাবে চলাচল করছে, তবে নতুন করে তেল না পাওয়ায় বেশির ভাগ মালিক তাঁদের নৌযান বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন। পুরো কক্সবাজার জেলায় সক্রিয় ট্রলারের সংখ্যা এখন ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ।
ট্রলার মালিকদের অভিযোগ, এই সংকটের পেছনে শুধু বৈশ্বিক পরিস্থিতি দায়ী নয়, স্থানীয় পর্যায়ে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার একটি অস্বচ্ছ চক্রও কাজ করছে। উপকূলবর্তী মহেশখালী এলাকা থেকে সাগরপথে চোরাইভাবে জ্বালানি পাচারের কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। এতে বৈধভাবে তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে ট্রলার মালিকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিমাণ তেলও মিলছে না।
কক্সবাজার জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ট্রলার চালাতে জ্বালানি ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এখন তেলই সবচেয়ে বড় সমস্যা। বেশির ভাগ ট্রলারের কাছে পর্যাপ্ত জ্বালানি নেই। যাঁরা পাচ্ছেন, তাঁরাও সীমিত পরিমাণে পাচ্ছেন, যা দিয়ে নিয়মিত সাগরে যাওয়া সম্ভব নয়। অনেক সময় এক সপ্তাহ বা ১০ দিন পর সামান্য তেল পাওয়া যাচ্ছে। এতে পুরো কার্যক্রমই ভেঙে পড়ছে বলে সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন জানান।
সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন আরও বলেন, সমুদ্রে ভাসমান জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাও কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মাছের স্বল্পতা এবং জলদস্যুদের তৎপরতা। ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় অনেক ট্রলার মালিক এখন আর ট্রলার পাঠাতে আগ্রহী নন। খরচ তুলতে না পারার আশঙ্কায় ট্রলার মালিকেরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় থাকছেন।
জেলার নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৬৪ হাজার ৪২৮ জন। এর বাইরে অনিবন্ধিত আরও বহু জেলে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্তত ১০ থেকে ২০ হাজার জেলে সাগরে যেতে পারছেন না বলে সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন জানান। এতে উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকায় কর্মহীনতা বাড়ছে।
জেলেদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংকট শুধু জ্বালানিতে সীমাবদ্ধ নয়। সাগরে গেলেও নিরাপত্তা নেই। মহেশখালীর ঘটিভাঙার জেলে আকতার হোসেন বলেন, আগে সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার সাগরে যাওয়া হতো। এখন তেল না থাকায় ট্রলার বন্ধ। জেলে আকতার হোসেন জানান, ঘরে বসে থাকতে হচ্ছে, আয় বন্ধ। পরিবারের খাবারের সংকট দেখা দিচ্ছে বলে জেলে আকতার হোসেন আক্ষেপ করেন।
একই কথা বলছেন হোয়ানক এলাকার জেলে জমি উদ্দিন। জেলে জমি উদ্দিন বলেন, সমুদ্রে গেলেও ভয় কাজ করে। জলদস্যুদের উপদ্রব বেড়েছে। মাছও আগের মতো পাওয়া যায় না। খরচ তুলতে না পারায় অনেকেই সাগরে যাচ্ছেন না বলে জেলে জমি উদ্দিন জানান। জেলে জমি উদ্দিন আরও বলেন, কয়েক দিন আয় বন্ধ থাকলেই সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এখন অনেকেই ধারদেনার ওপর নির্ভর করছেন।
এদিকে সামনে রয়েছে মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা। প্রতিবছরের মতো এবারও মাছের প্রজনন মৌসুমকে সামনে রেখে আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকবে টানা ৫৮ দিন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান অবস্থায় এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে সংকট আরও তীব্র হবে। যাঁরা এখনো সাগরে রয়েছেন, তাঁরা ফিরে এলে পুনরায় সাগরে যেতে পারবেন না।
নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আপত্তিও জানিয়েছেন ট্রলার মালিকেরা। সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ২০১৫ সালের পর থেকে এই সময়সীমা ছোট জেলেদের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে। দীর্ঘ সময় সাগরে যেতে না পারলে জেলেদের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যায়। এতে বাজারে মাছের সরবরাহ কমার আশঙ্কাও রয়েছে বলে সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন উল্লেখ করেন।
উপকূলের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, একদিকে জ্বালানি সরবরাহের অস্বাভাবিকতা, অন্যদিকে সাগরে নিরাপত্তাহীনতা—এই দুইয়ের প্রভাবে ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ছে মাছ ধরার কার্যক্রম। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রাকৃতিক ও মৌসুমি বাস্তবতা। সব মিলিয়ে উপকূলীয় অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখন অনিশ্চয়তার মুখে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সংকট কাটানো কঠিন হবে। একই সঙ্গে পাচার ও অবৈধ সরবরাহ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি না থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। উপকূলের জেলেরা এখন অপেক্ষায় আছেন স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার, যাতে আবার সাগরে গিয়ে জীবিকার চাকা ঘোরাতে পারেন।
এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তর কক্সবাজারের জেলা কর্মকর্তা নাজমুল হুদা বলেন, সবাই বৈশ্বিক সংকটের শিকার, তবে কক্সবাজারের বোটগুলো থেকে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্টভাবে তেলের সংকট নিয়ে কোনো অভিযোগ জেলা কর্মকর্তা নাজমুল হুদা পাননি। পর্যাপ্ত পরিমাণ মাছও সাগর থেকে আসছে। নিষেধাজ্ঞার সময়ে এবারও জেলার নিবন্ধিত ৬৪ হাজার ৪২৮ জন জেলেকে মাসিক ৪০ কেজি হারে ৭৭.৩৩ কেজি চাল বিতরণের জন্য ইতিমধ্যে কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছেন বলে জেলা কর্মকর্তা নাজমুল হুদা নিশ্চিত করেন। তবে তেল নিয়ে কেউ আলাদাভাবে অভিযোগ দিলে তা নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত আছেন বলে জেলা কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান।