সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

হাম প্রতিরোধে আমাদের মূল ঘাটতি কোথায়?

নজরুল কবির দীপু | প্রকাশিতঃ ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ৮:৫৭ অপরাহ্ন


দেশে সংক্রামক ব্যাধি হামের প্রাদুর্ভাব বর্তমানে যে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, তা কেবল উদ্বেগজনক নয়, বরং গোটা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা। প্রতিদিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর যে দীর্ঘ মিছিল আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা কোনোভাবেই একটি আধুনিক, মানবিক ও স্থিতিশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিফলন হতে পারে না। হাম মূলত একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ। অথচ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে যখন প্রতিনিয়ত শিশুদের প্রাণ ঝরে যায়, তখন বুঝতে হবে আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার গভীরে মারাত্মক কোনো অবহেলা বা পচন ধরেছে। একটি শিশুর মৃত্যু মানে কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের সুরক্ষাবলয়ের চরম ব্যর্থতার একটি করুণ দৃষ্টান্ত।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে শিউরে উঠতে হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রবিবারের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দশজন নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চার শিশুর মৃত্যু যে সরাসরি হামের কারণেই হয়েছে, তা নিশ্চিত করেছে স্বয়ং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বাকি ছয়জন শিশু মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ের মধ্যে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৭৬২ জন শিশু এবং নতুন করে হাম শনাক্ত হয়েছে ১৫০ জনের শরীরে। গত ১১ এপ্রিল সকাল থেকে ১২ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত সংগৃহীত এই তথ্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। মাত্র ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ২৬৮ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে, যার মধ্যে কেবল ঢাকা বিভাগেই আক্রান্তের সংখ্যা ৫৮০ জন।

গত এক দিনের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, হামে নিশ্চিতভাবে মারা যাওয়া চার শিশুর সবাই ঢাকার বাসিন্দা। উপসর্গ নিয়ে মৃত ছয় শিশুর পাঁচটি ঢাকা বিভাগের এবং একটি খুলনার। এই ভাইরাসের থাবা সবচেয়ে বেশি পড়েছে রাজধানী ও এর আশপাশের অঞ্চলে। ঢাকা বিভাগে এক দিনেই সর্বোচ্চ ১২৩ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। অন্যদিকে রাজশাহী বিভাগে শনাক্ত হয়েছে ২১ জন এবং সিলেট ও চট্টগ্রামে তুলনামূলক কম, একজন করে রোগী শনাক্ত হয়েছে। হাসপাতালে রোগী ভর্তির ক্ষেত্রেও ঢাকার চিত্র সবচেয়ে নাজুক। এক দিনে ভর্তি হওয়া ৭৬২ জনের মধ্যে ৩৫৭ জনই ঢাকা বিভাগের। অন্যদিকে রংপুর ও ময়মনসিংহে ভর্তি রোগীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম, যথাক্রমে ১১ ও ২২ জন। তবে সাময়িক স্বস্তির একটি ক্ষুদ্র জায়গা হলো, এই ২৪ ঘণ্টায় ৬৩৪ জন রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়েছেন, যার মধ্যে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৩১২ জন ও চট্টগ্রাম বিভাগে ১২০ জন।

কিন্তু সাময়িক এই স্বস্তি দীর্ঘমেয়াদি আতঙ্কের কাছে একেবারেই ম্লান। গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত, এই ২৯ দিনের সার্বিক চিত্র পর্যালোচনা করলে গা শিউরে ওঠে। এই এক মাসেরও কম সময়ে হামে সরাসরি প্রাণ হারিয়েছে ২৮টি শিশু। আর সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য হলো, এই একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে ১৫১টি শিশু। উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া শিশুদের এই বিশাল সংখ্যা প্রমাণ করে, রোগ শনাক্তকরণের আগেই অনেক শিশু চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছে অথবা সঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারছে না। এই ২৯ দিনে দেশজুড়ে ১৫ হাজার ৬৫৩ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে, যাঁদের মধ্যে ১০ হাজার ২২৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৬৩৯ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে। যদিও ৭ হাজার ৬৫৬ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন, তবুও সন্দেহভাজন এবং আক্রান্ত রোগীর এই বিপুল পরিমাণ পরিসংখ্যান দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে পরিস্থিতি এখন প্রায় মহামারির পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনের তথ্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মৃত্যুর সংখ্যা ও সংক্রমণের হারের দিক থেকে ঢাকা এবং রাজশাহী বিভাগ সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। রাজশাহী বিভাগে ৬৫ জন এবং ঢাকা বিভাগে ৫৯ জনের মৃত্যুর যে খবর পাওয়া যাচ্ছে, তা পুরোদস্তুর আতঙ্ক জাগানিয়া। এর প্রাদুর্ভাব কেবল এই দুই বিভাগেই সীমাবদ্ধ নেই। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বরিশাল ও পাবনার মতো জেলাগুলোতেও শিশু আক্রান্ত হওয়ার হার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এই জেলাগুলোর হাসপাতালগুলোতে এখন শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে পড়েছে। অনেক হাসপাতালে মেঝেতে শুইয়ে শিশুদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। আইসোলেশন ওয়ার্ডগুলো রোগীতে উপচে পড়ছে। এর সোজা অর্থ হলো, দেশের একটি বিশালসংখ্যক শিশু এখন জীবনঘাতী এই ভাইরাসের নির্মম কবলে পড়েছে।

এখানে সবচেয়ে বড় এবং মৌলিক প্রশ্নটি হচ্ছে—যে রোগটি সঠিক সময়ে টিকাদানের মাধ্যমে শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য, সেই রোগে কেন এত শিশুর অকালে মৃত্যু হবে? আমাদের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে ঠিক কোথায় এত বড় ঘাটতি রয়ে গেল? কেন হাজার হাজার শিশু টিকার এই অতি জরুরি সুরক্ষাবলয় থেকে বাইরে রয়ে গেল? এর পেছনে কি মাঠপর্যায়ের কর্মীদের গাফিলতি, নাকি টিকা সরবরাহে ও নজরদারিতে কোনো কাঠামোগত দুর্বলতা ছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জরুরিভিত্তিতে খুঁজে বের করা প্রয়োজন। বিশেষ করে, জুলাইয়ের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র যখন নানাবিধ সংস্কারের মধ্য দিয়ে একটি নতুন কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে, তখন স্বাস্থ্য খাতের এই চরম ভেঙে পড়া চিত্র কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

এই চরম সংকট নিরসনে এখন কেবল হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ডের শয্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি এবং অতি জরুরি কিছু প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ। অবিলম্বে দেশজুড়ে ‘হাম-রুবেলা স্পেশাল ক্রাশ প্রোগ্রাম’ বা জরুরি টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায়, বস্তিতে এবং পাহাড়ি বা চরাঞ্চলের মতো দুর্গম এলাকাগুলোতে স্বাস্থ্যকর্মীদের পাঠাতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে যেন একটি শিশুও এই টিকার আওতার বাইরে না থাকে। একই সঙ্গে ব্যাপক জনসচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। অভিভাবকেরা যেন হামের প্রাথমিক লক্ষণ দেখামাত্রই আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে যোগাযোগ করেন, সে বিষয়ে জোরালো প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে।

সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগকে এই মহামারিতুল্য পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সাথে বিভাগীয় ও জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করে ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুযোগ নিশ্চিত করা এখনই প্রয়োজন। আমাদের স্বাস্থ্য খাতের অবহেলা, অব্যবস্থাপনা ও গাফিলতির কারণে আর কোনো মায়ের কোল খালি হোক, আর কোনো শিশুর প্রাণ অকালে ঝরে যাক—তা দেশবাসী আর মেনে নেবে না। হামের এই ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব আমাদের অত্যন্ত রূঢ়ভাবে মনে করিয়ে দেয় যে, জনস্বাস্থ্য নিয়ে অবহেলা করার অর্থ হলো একটি জাতির ভবিষ্যৎকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ফেলা। কাজেই এখন আর কোনোভাবেই গাফিলতি নয়, বরং সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা, জবাবদিহি ও পেশাদারিত্ব দেখানোর প্রকৃত সময়।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।