
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর চট্টগ্রামের সেবা সংস্থা ও প্রশাসনিক পদগুলোতে দায়িত্ব পেতে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন মনোনয়নবঞ্চিত বিএনপি নেতারা। বিশেষ করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের শীর্ষ পদে আসীন হতে উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির তিন হেভিওয়েট নেতা—ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন, ইদ্রিস মিয়া এবং লায়ন হেলাল উদ্দিনের নাম এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জেলা পরিষদের প্রশাসক বা সিডিএ চেয়ারম্যান হতে এই তিন নেতা ঢাকা ও চট্টগ্রামে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের দপ্তরে ছুটছেন। বিগত সরকারের আমলের ত্যাগ, হামলা-মামলা ও নির্যাতনের বিবরণ দিয়ে নিজেদের প্রার্থিতা জোরালো করার চেষ্টা করছেন তারা। সরকার ও দলের উচ্চ পর্যায়ে নিজ নিজ অবস্থান থেকে লবিং চালাচ্ছেন প্রত্যেকেই।
এই দৌড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন উত্তর জেলা বিএনপির ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন। চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে মনোনয়নবঞ্চিত এই নেতা ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির মাঠে সক্রিয়। গত ১৭ বছরে তার বিরুদ্ধে ২৪টি রাজনৈতিক মামলা হয়েছে এবং চার দফায় কারাভোগ করেছেন ১৫ মাসের বেশি। এছাড়া দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে গিয়ে বিদেশেও কারাবন্দী হয়েছিলেন তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই নেতা। দীর্ঘ এই ত্যাগ তাকে তৃণমূল নেতাকর্মীদের আস্থার প্রতীকে পরিণত করেছে।
সন্দ্বীপ উপজেলা বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা জানান, একসময় প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে একটি স্থানীয় পত্রিকায় মানহানিকর সংবাদ প্রকাশিত হলে বেলায়েত হোসেন বাদী হয়ে ১০০ কোটি টাকার মানহানি মামলা করেছিলেন। সে সময় হামলা-মামলার ভয় ও বৈরী পরিস্থিতিতেও দলের প্রতি তার আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত। ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচন এবং ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে তার অংশগ্রহণ দলের প্রতি অবিচল আস্থার প্রমাণ দেয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনেও মনোনয়ন চেয়ে শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্তে সরে দাঁড়ান তিনি।
পেশায় প্রকৌশলী হওয়ায় জেলা পরিষদের পাশাপাশি সিডিএ চেয়ারম্যান হিসেবেও বেলায়েত হোসেনের নাম বেশ জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে। ১৯৭৭ সালে সন্দ্বীপের কার্লিল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৭৯ সালে চট্টগ্রাম সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসীন কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর তিনি চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা করেন। ওই সময় তিনি ছাত্র সংসদের জিএস ও ছাত্রদলের আহ্বায়ক ছিলেন। চট্টগ্রামের পরিকল্পিত উন্নয়নে একজন দক্ষ প্রকৌশলী ও রাজনৈতিক নেতার যে সমন্বয় প্রয়োজন, তা তার মধ্যে রয়েছে বলে মনে করে সচেতন মহল।
অন্যদিকে, এই দৌড়ে জোরালো আলোচনায় রয়েছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়া এবং সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিন। সাংগঠনিক দক্ষতা ও জনপ্রিয়তার কারণে দক্ষিণ জেলার অনেক নেতাকর্মী তাদের জেলা পরিষদের প্রশাসক পদে দেখতে চান। দায়িত্বে আসার ক্ষেত্রে মানুষের সাথে তাদের নিবিড় সম্পৃক্ততাকে বড় যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে নগর ও জেলা বিএনপির একাধিক নেতার ভাষ্য, দীর্ঘ দেড় দশকের আন্দোলন-সংগ্রাম ও কারাবরণের অভিজ্ঞতায় তৃণমূলের বড় অংশের সমর্থন বেলায়েত হোসেনের দিকেই। চট্টগ্রামের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে এবং ত্যাগী কর্মীদের সাহস জোগাতে তার মতো নেতৃত্বের বিকল্প নেই বলে মনে করছেন তারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, দুঃসময়ে রাজপথে থাকা এসব নেতার যথাযথ মূল্যায়ন তৃণমূলের জন্য বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। শেষ পর্যন্ত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই ত্যাগী নেতাদের কীভাবে মূল্যায়ন করেন এবং সিডিএ বা জেলা পরিষদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কার কাঁধে তুলে দেন, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষায় চট্টগ্রামবাসী।