
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার জয়াগ বাজার এলাকায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের জমি নিয়ে বিরোধের জেরে উচ্ছেদের হুমকিতে আতঙ্কিত হয়ে আফিয়া বেগম নামের এক বৃদ্ধার মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। নিহত আফিয়া বেগম স্থানীয় প্রতিবন্ধী ব্যবসায়ী বেলাল হোসেনের মা।
ভুক্তভোগী বেলাল হোসেনের পরিবারের অভিযোগ, ‘এসো গড়ি উন্নয়ন সংস্থা’র পরিচালক আবদুল আউয়াল গত সোমবার (১৩ এপ্রিল) দলবল নিয়ে এসে তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বসতঘর থেকে উচ্ছেদের হুমকি দেন। এই হুমকিতে আতঙ্কিত হয়ে আফিয়া বেগম অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মঙ্গলবার সকালে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
জানা যায়, জয়াগ গ্রামের বাসিন্দা আলী আশরাফ খান সওজে চাকরি করতেন। তিনি জয়াগ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাশে সওজের জায়গা ইজারা নিয়ে পরিবারসহ বসবাস ও একটি সেনেটারি সরঞ্জামের দোকান পরিচালনা করতেন। আলী আশরাফ খানের মৃত্যুর পর তার শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলে বেলাল হোসেন দোকানটি পরিচালনা করে আসছেন। পরিবারের আরেক সদস্য আব্দুস সোবহান জানান, ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নবায়নের জন্য গেলে সওজ কার্যালয় থেকে নতুন বন্দোবস্ত বন্ধ থাকার কথা জানানো হয়।
বেলাল হোসেনের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ওই জমির ওপর আবদুল আউয়ালের নজর ছিল। সোমবার বিকেলে ১০-১২ জন লোক নিয়ে এসে আবদুল আউয়াল তাকে এবং তার মা আফিয়া বেগমকে পাঁচ দিনের মধ্যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরিয়ে নিতে বলেন, অন্যথায় বসতঘর উচ্ছেদের হুমকি দেন। এই ঘটনার পরপরই আফিয়া বেগম আতঙ্কিত ও অসুস্থ হয়ে পড়েন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর নোয়াখালী সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে আবাসিকের প্রবেশপথ নির্মাণের জন্য আবদুল আউয়াল ৩.৬৮ শতাংশ জমি ইজারার আবেদন করেছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে শর্ত সাপেক্ষে তাকে অনুমোদন দেওয়া হয়।

তবে সওজের ম্যাপ বা নকশা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আবদুল আউয়ালকে নির্দিষ্ট একটি বক্স করা অংশের ইজারা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি ইজারার শর্তের বাইরে গিয়ে নকশার বাঁ পাশের লাল দাগ চিহ্নিত অংশে থাকা বেলাল হোসেনের দোকানটি উচ্ছেদের চেষ্টা করছেন, যা তার ইজারাকৃত জায়গার বাইরে। অন্যদিকে, ২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর আলী আশরাফ খান ১৬ হাজার ৪০ টাকা জমা দিয়ে জমিটি কৃষি ও মৎস্য চাষের জন্য ইজারা নিয়েছিলেন বলে রসিদ থেকে জানা যায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, আবদুল আউয়াল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচয়দানকারী জাহাঙ্গীর আলমের অনুসারী হিসেবে রাজনীতি করতেন। এসো গড়ি উন্নয়ন সংস্থার নামে আবদুল আউয়ালের বিরুদ্ধে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি দখলের অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে জয়াগ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মহিন উদ্দিন জানান, সরকারি ওই জায়গায় প্রতিবন্ধী বেলাল হোসেনের পরিবার বসবাস করছে এবং তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে। তবে জমিটি যে নতুন করে আবদুল আউয়ালকে ইজারা দেওয়া হয়েছে, তা চেয়ারম্যান মহিন উদ্দিন জানেন না।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে নোয়াখালী সওজ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফরিদ উদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রকৌশলী মো. ফরিদ উদ্দিন ফোন রিসিভ করেননি।
তবে প্রতিবন্ধী ব্যবসায়ী বেলাল হোসেনকে হুমকির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আবদুল আউয়াল। আবদুল আউয়াল দাবি করেন, তিনি তাদের কিছুই বলেননি; বরং সড়কের কাজ চলার সময় সওজের লোকেরাই তাদের সরে যেতে বলেছে। আফিয়া বেগমের মৃত্যুর বিষয়ে আবদুল আউয়াল দাবি করেন, ওই বৃদ্ধা দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন এবং তাকে হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
তবে আবদুল আউয়ালের এই দাবি মিথ্যা বলে নিশ্চিত করেছেন ভুক্তভোগী বেলাল হোসেনের পরিবারের এক সদস্য এবং তাদের এক প্রতিবেশী। ওই প্রতিবেশী ও পরিবারের সদস্য জানান, নিহত আফিয়া বেগমের কোনো ক্যান্সার ছিল না এবং হাসপাতাল থেকে তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার মতো কোনো ঘটনাও ঘটেনি। আফিয়া বেগমের কেবল ডায়াবেটিস ছিল বলে তারা নিশ্চিত করেছেন।