
বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের আন্দোলনকে এখনই ততটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে না ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। এই ইস্যুতে বিরোধী দলের সঙ্গে কোনো পালটাপালটি বা কঠোর অবস্থানে না গিয়ে বিষয়টি ‘কৌশলে’ মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্ষমতাসীন দলটি। অন্যদিকে, জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কার ইস্যুতে ক্ষমতাসীন দলকে চাপের মুখে রাখার কৌশল হিসেবে সংসদের ভেতরে ও রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিরোধী জোট।
বিএনপি নেতারা মনে করছেন, বাদ পড়া ১৬টি অধ্যাদেশ নিয়ে মাঠ গরম করে বিরোধী দলগুলো মূলত সরকারের জনপ্রিয়তা কমানোর চেষ্টা করছে। তাই যাচাই-বাছাই শেষে এ সংক্রান্ত বিল সংসদে এনে জনগণের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান মঙ্গলবার টাঙ্গাইলে এক সমাবেশে এ বিষয়ে দলের অবস্থান স্পষ্ট করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস সনদ সই করার জন্য যখন ডেকেছিলেন, সবচেয়ে প্রথমে বিএনপি সেখানে গিয়েছিল। বিএনপি জুলাই সনদ সই করে এসেছে এবং সেই সনদের প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ ও প্রতিটি লাইন সরকার বাস্তবায়ন করবে।
একই সঙ্গে জনগণকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, যারা খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকের কার্ড, পেশাদার খেলোয়াড় তৈরিসহ জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করবে, বিএনপি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের প্রতিহত করবে।
এর আগে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে যে ১৬টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হয়নি, সেগুলোর অধিকতর যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। কিন্তু কিছু মহল সরকার এসব ‘অধ্যাদেশ বাদ দিয়েছে’ বলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এ বিষয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান জানান।
একই সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ গণভোটের বৈধতা প্রসঙ্গে কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, অধ্যাদেশ জারি হয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সেটার বৈধতা আছে। সুতরাং এটি নিয়ে বিরোধী দলের হুমকি দেওয়ার কোনো বিষয় নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স সংবাদমাধ্যমকে জানান, একটি মহল রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার জন্য অহেতুক বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বক্তব্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে। সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স জোর দিয়ে বলেন, বিএনপি স্পষ্টত বলছে যে তারা সনদের প্রতিটা লাইন অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে, তাই এটি নিয়ে পানি ঘোলা করার কোনো প্রয়োজন নেই।
অন্যদিকে, জুলাই সনদ বা সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন প্রশ্নে জাতীয় সংসদে সব বিষয়ে একমত হতে না পারায় রাজপথের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। প্রাথমিক কর্মসূচি হিসেবে তারা সমাবেশ, লিফলেট বিতরণ ও সেমিনার চালিয়ে যাচ্ছে। বিরোধী দলগুলো মনে করছে, একদিকে আন্দোলনে যাওয়ার বিকল্প নেই, অন্যদিকে নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে এখনই বড় কোনো শোডাউনে গেলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার সুবিধা হতে পারে। তাই ভিন্ন কৌশলে তারা এগোচ্ছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ১১ দলীয় ঐক্য আয়োজিত এক সেমিনারে বলেছেন, আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে এবং এই আন্দোলনকে তিলে তিলে সফলতার দিকে নিয়ে যেতে হবে। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যতদিন জাতির অধিকারের পক্ষে লড়াই করা সম্ভব, ততদিনই তারা সংসদে থাকবেন, তার বাইরে এক সেকেন্ডও নয়।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক জানান, জুলাই সনদের বিষয়ে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আল্লামা মামুনুল হক বলেন, এই মুহূর্তে বড় কোনো শোডাউনে না গিয়ে তারা জনগণকে সচেতন করছেন এবং সরকার গণরায় বাস্তবায়নে এগিয়ে না এলে একপর্যায়ে চূড়ান্ত কর্মসূচি আসবে।
১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ জানান, গণভোটের রায় যতক্ষণ না বাস্তবায়ন হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ অভিযোগ করেন, সরকারি দল সংবিধান সংশোধনের কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চায়, কিন্তু তারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ঠিক রেখে মনমতো সংশোধন হতে দেবেন না।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব জানান, চলমান গণসংযোগ কর্মসূচি শেষ হলে শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের পর নতুন কর্মসূচি দেওয়া হবে। আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, সংসদের ভেতরে এবং রাজপথে তাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান জানান, জনগণ যে রায় দিয়েছে তার বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক ওমর ফারুক মন্তব্য করেন, সংসদে সংকট সমাধানের রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে বলেই রাজপথের কর্মসূচি আসছে। অধ্যাপক ওমর ফারুক মনে করেন, সরকার এগিয়ে না এলে তাদের রাজপথেই সমাধানের পথ বেছে নিতে হবে।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান জানান, দেশের প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ হ্যাঁ ভোট দিলেও জনগণের সেই ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে সরকার অস্বীকার করছে। ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, আমরা আশা করেছিলাম সংসদেই বিষয়টির সুরাহা হবে, কিন্তু সরকার বাঁকা পথে হাঁটছে, তাই রায় বাস্তবায়নে রাজপথের বিকল্প নেই।