
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী পৌরসভার ভানুয়াই গ্রামে নির্মাণাধীন একটি সড়কের ইটের গাঁথুনি হাত দিয়ে টান দিলেই খুলে আসার অভিযোগ উঠেছে। সড়ক নির্মাণের কাজ চলাকালে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে গাঁথুনির ইট ও সিমেন্ট-বালুর মিশ্রণ খসে পড়ছে। ইটের গাঁথুনি হাত দিয়ে খুলে আসার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিতে ব্যাপক অনিয়ম দেখা দেওয়ায় বর্তমানে কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে।
সোনাইমুড়ী পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘লোকাল গভর্নমেন্ট কোভিড-১৯ রেসপন্স অ্যান্ড রিকভারি প্রজেক্ট’ (এলজিসিআরআরপি)-এর অধীনে ১ হাজার ১৩৮ মিটার দৈর্ঘ্যের এই সড়কের নির্মাণকাজ চলছে। এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত মূল্য ছিল দুই কোটি ৩৪ লাখ ৯৫ হাজার ৩০১ টাকা। আর চুক্তি হয়েছে এক কোটি ৯৩ লাখ ৭৭ হাজার ১৫১ টাকায়।
সোনাইমুড়ী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বিএসআর রোড (ভানুয়াই মসজিদ) থেকে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন রোড পর্যন্ত ৬২৫ মিটার এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বিএসআর রোডে অবস্থিত সোনাইমুড়ী আলিয়া মাদ্রাসা থেকে এলএলএস রোড পর্যন্ত ৫১৩ মিটার সড়কে এই কাজ চলছে। বেগমগঞ্জের একলাশপুর এলাকার মো. নূর নবীর মালিকানাধীন মেসার্স প্রাইম ট্রেডার্স এই ঠিকাদারি কাজের দায়িত্বে রয়েছেন। তবে ভানুয়াই মসজিদ সংলগ্ন নির্মাণাধীন সড়কেই এই ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে ভানুয়াই গ্রামের ওই সড়কে গিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকতে দেখা যায়। সেখানে নিম্নমানের ইট ও খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে এবং হাতের চাপেই খোয়া গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। পুরাতন ইট দিয়ে সড়কের দুই পাশে গাঁথুনি দেওয়ার প্রমাণও পাওয়া গেছে। অনিয়মের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনতে এলাকাবাসী বেশ কিছু ইটের গাঁথুনি হাত দিয়ে খুলে ফেলে রেখেছেন।
ভানুয়াই গ্রামের ভাঙ্গাচোরা সড়কে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করা যাত্রী রবিউল ইসলাম জানান, রাস্তার কাজে চরম অবহেলা হচ্ছে এবং কাজ নিয়ে যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ওই সড়কের ইজিবাইক চালক নিজাম অভিযোগ করেন, নিম্নমানের ইট, বালু ও সিমেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে, যার কারণে ইজিবাইকের চাকার ঘষা লাগলেও ইট খুলে যাচ্ছে।
স্থানীয় ব্যাপারী বাড়ির বাসিন্দা স্বপন জানান, নিয়ম অনুযায়ী ৪ বস্তা বালুর সঙ্গে ১ বস্তা সিমেন্টের মিশ্রণ দেওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৯ বস্তা বালুর সঙ্গে ১ বস্তা সিমেন্ট দিয়ে গাঁথুনি দিচ্ছে। বাসিন্দা স্বপন আরও অভিযোগ করেন, সড়কের পাশে গাইড ওয়াল নির্মাণের কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে মেসার্স প্রাইম ট্রেডার্সের মালিক মো. নূর নবীকে পাওয়া যায়নি। তবে পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, কাগজে-কলমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে মো. নূর নবীর মেসার্স প্রাইম ট্রেডার্সের নাম থাকলেও কাজটি পরিচালনা করছেন জাকির হোসেন নামের এক ব্যক্তি। মুঠোফোনে কাজের অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জাকির হোসেন দাবি করেন, কাজে কোনো মানহীন মালামাল ব্যবহার করা হচ্ছে না।
জাকির হোসেন জানান, গাঁথুনি দেওয়ার পরপরই এলাকার লোকজন টেনে ইট খুলে ফেলেছেন এবং কাজের মান সম্পর্কে পৌর প্রকৌশলী অবগত আছেন। জাকির হোসেন আরও জানান, ঠিকাদার মো. নূর নবী তার বন্ধু হওয়ায় তিনি কাজটি দেখাশোনা করছেন।
এ বিষয়ে সোনাইমুড়ী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইফুল আজিম জানান, ঠিকাদারি কাজটি পেয়েছে বড় প্রতিষ্ঠান মেসার্স প্রাইম ট্রেডার্স, তবে কাজটি যিনি পরিচালনা করছেন তিনি একেবারে নতুন। নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইফুল আজিম নিশ্চিত করেন যে, তিনি সড়কের ইট খুলে ফেলার ভিডিওটি দেখেছেন এবং বিষয়টি পর্যবেক্ষণের জন্য ঘটনাস্থলে পৌরসভার প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।
অন্যদিকে, অনিয়মের বিষয়ে কথা বলতে সোনাইমুড়ী পৌরসভার প্রশাসক নাছরিন আক্তারের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও পৌর প্রশাসক নাছরিন আক্তার ফোন ধরেননি।