
বিশ্বব্যাপী শিশুমৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে একসময় পরিচিত ছিল হাম। আধুনিক চিকিৎসা ও টিকাদান কর্মসূচির ফলে এর প্রকোপ অনেক কমলেও এখনো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ব্যাপক আকারে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়, যেখানে লক্ষাধিক শিশু আক্রান্ত হয় এবং হাজার হাজার মৃত্যু ঘটে।
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠনের সময় হামের প্রকোপ ছিল অত্যন্ত বেশি। ১৯৭৯ সালে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) চালুর মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। ২০০০ সালের পর থেকে নিয়মিত টিকাদান ও ক্যাম্পেইনের ফলে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
তবে ২০১৪, ২০১৭ এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু এলাকায় টিকাদানের ঘাটতি ও জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে পুনরায় প্রাদুর্ভাব দেখা যায়, যা প্রমাণ করে যে রোগটি এখনও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। যদিও এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ, তবুও সচেতনতার অভাব, টিকাদানে অনীহা এবং স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষার কারণে প্রতিবছর বহু মানুষ এতে আক্রান্ত হয়। শিশুদের জন্য এটি বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
হাম কী?
হাম বা Measles একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে বাতাসের মাধ্যমে ভাইরাসটি সহজেই অন্যদের শরীরে প্রবেশ করে। এই রোগটি প্রধানত শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তবে টিকা না নেওয়া প্রাপ্তবয়স্করাও এতে আক্রান্ত হতে পারেন। জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেখানে টিকাদানের আওতা শতভাগ নিশ্চিত হয়নি।
উপসর্গ ও লক্ষণ:
হামের লক্ষণ সাধারণত সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে প্রকাশ পায়। এর প্রধান উপসর্গগুলো হলো: উচ্চ জ্বর (১০১-১০৪°F পর্যন্ত), শুকনো কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া (কনজাংটিভাইটিস), মুখের ভেতরে সাদা দাগ (কোপলিক স্পট) এবং ৩-৫ দিনের মধ্যে সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি ওঠা। গুরুতর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) হতে পারে।
চিকিৎসা পদ্ধতি:
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) -এর নির্দেশনা অনুযায়ী হামের নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। তবে সহায়ক চিকিৎসাই এর মূল ভিত্তি। হামের নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক ওষুধ নেই, তবে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। যেমন: পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল ব্যবহার (ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী), পর্যাপ্ত তরল পান করা এবং চোখ ও ত্বকের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা।
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে জটিলতার ঝুঁকি কমে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে করণীয়:
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ৩০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও ১৫৬ শিশু (ইত্তেফাক, ১৩ এপ্রিল ২০২৬)।
এ ছাড়া, এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ১৭ হাজার ২৪ জন, যাদের মধ্যে ১০ হাজার ৯৫৪ জনকে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে ২ হাজার ৭২১ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে এবং চিকিৎসা শেষে ৮ হাজার ৩৬৯ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
বাংলাদেশে হামের বিস্তার রোধে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:
১. টিকাদান নিশ্চিতকরণ: সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় সকল শিশুকে নির্ধারিত সময়ে টিকা প্রদান করতে হবে।
২. জনসচেতনতা বৃদ্ধি: অভিভাবকদের টিকার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং ভুল ধারণা দূর করতে হবে।
৩. আক্রান্ত ব্যক্তির পৃথকীকরণ: হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা অত্যন্ত জরুরি।
৪. স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ: নিয়মিত হাত ধোয়া, হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা আবশ্যক।
৫. দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ: লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে।
হাম একটি মারাত্মক হলেও সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সঠিক সময়ে টিকাদান, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমে আমরা সহজেই এই রোগের বিস্তার রোধ করতে পারি। একটি সুস্থ ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে আমাদের সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য।
লেখক: অধ্যাপক, প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।