
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার জয়াগ বাজার সংলগ্ন বেগমগঞ্জ-সোনাইমুড়ী-রামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা আওয়ামী লীগের গবেষণা ও তথ্য বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল আউয়ালের বিরুদ্ধে। তিনি স্থানীয় ‘এসোগড়ি উন্নয়ন সংস্থা’র নির্বাহী পরিচালক। মাত্র ৩.৬৮ শতাংশ জমির লিজের কাগজকে পুঁজি করে তিনি ১৩ শতাংশ সম্পত্তি দখল করে রেখেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্ছেদ করারও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে এই নেতার বিরুদ্ধে।
জয়াগের বীর মুক্তিযোদ্ধা একরামুল হক সড়ক সংলগ্ন চা দোকান ব্যবসায়ী ষাটোর্ধ্ব ওবায়দুল্লাহ জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে ওই জায়গায় ব্যবসা করে আসছেন এবং দাদা-বাবার আমল থেকেই জমিটি ভোগদখলে রেখেছেন। তার অভিযোগ, ৩.৬৮ শতাংশ জমির লিজের কাগজ দেখিয়ে ১৩ শতাংশ জমির পুরোটিই দখল করেছেন মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল। এছাড়া বিভিন্ন লোকজন নিয়ে এসে শনিবারের মধ্যে জমি ছেড়ে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন তিনি।
উচ্ছেদের শিকার হওয়া আব্দুল আলিম ট্রেডার্সের ব্যবসায়ী রুবেল অভিযোগ করেন, মহাসড়কের চার লেনের কাজ শুরু হলে তিনি দোকান ভেঙে মালামাল সরিয়ে সওজের অব্যবহৃত জায়গায় চলে আসেন। কিন্তু রাতারাতি মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল তার মালামাল রাখা জমিসহ সওজের প্রায় ২০০ ফুট জায়গা টিনের ঘেরা দিয়ে দখলে নিয়ে নেন। এর প্রতিবাদ করতে গেলে মোহাম্মদ আবদুল আউয়ালের লোকজন তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
সম্প্রতি এক প্রতিবন্ধী ব্যবসায়ীকে উচ্ছেদ করতে হুমকি-ধমকির ঘটনায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। অভিযোগ ওঠে, উচ্ছেদের হুমকির আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে ওই প্রতিবন্ধী ব্যবসায়ীর বৃদ্ধা মা আফিয়া খাতুনের মৃত্যু হয়েছে। এসব সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল। তবে ওই বক্তব্যের তথ্য যাচাই করতে গিয়ে নানা অসংগতি ও মিথ্যা তথ্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ফেসবুক ভিডিওতে মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল দাবি করেন, তার লিজ নেওয়া জমি একটি চক্র দখলের চেষ্টা করছে। তবে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কাগজে-কলমে তিনি পূর্ব পাশের ৩.৬৮ শতাংশ জমি ইজারা পেলেও বাস্তবে পুরো জমিটাই টিন দিয়ে ঘিরে রেখেছেন। উল্টো তিনি এখন উত্তর পাশের বীর মুক্তিযোদ্ধা একরামুল হক সড়ক সংলগ্ন চা দোকান ও স্যানিটারি মালামালের দোকান উচ্ছেদ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
বক্তব্যের সময় মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল বেশ কিছু কাগজ ও একটি নকশা তুলে ধরেন। তিনি নকশাটিকে সড়ক বিভাগের দেওয়া ইজারার জমি বলে দাবি করলেও ওই কাগজে নোয়াখালী সওজের কোনো কর্মকর্তার সিল বা স্বাক্ষর ছিল না। অন্যদিকে, প্রতিবেদকের হাতে থাকা সওজ কর্মকর্তাদের সিল ও স্বাক্ষর সংবলিত মূল নকশার সঙ্গে মোহাম্মদ আবদুল আউয়ালের দেখানো নকশার বিস্তর পার্থক্য পাওয়া গেছে।
মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল আরও দাবি করেন, প্রতিবন্ধী ব্যবসায়ীকে উচ্ছেদ করতে কোনো হুমকি দেওয়া হয়নি, বরং সওজ কর্তৃপক্ষ স্ব-উদ্যোগে দখলদারদের জায়গা ছেড়ে দিতে অনুরোধ জানিয়েছে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বিষয়টি অবহিত করেছে।
তবে জয়াগ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মহিন উদ্দিন জানান, জমিটি লিজ হওয়ার কোনো তথ্য তার জানা নেই এবং সওজ কর্তৃপক্ষের উচ্ছেদ অভিযানের বিষয়েও তিনি অবগত নন। সরকারি ওই জায়গায় প্রতিবন্ধীর পরিবার বসবাস করছে এবং তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এ কারণে প্রয়োজন ছাড়া ওই প্রতিবন্ধী ব্যবসায়ীকে উচ্ছেদ না করার জন্য সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) অনুরোধ করেছিলেন মহিন উদ্দিন।
ভিডিওতে মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল আরও জানান, যারা জমি জবরদখল করে রেখেছেন, তাদের মা দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে ভুগছিলেন। তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, নিহত আফিয়া খাতুন ক্যানসার নয়, হৃদরোগী ছিলেন। বাংলাদেশ হার্ট ফাউন্ডেশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের ব্যবস্থাপত্র থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এ বিষয়ে নিহত আফিয়া খাতুনের মেয়ে লিলি আক্তার দাবি করেন, মোহাম্মদ আবদুল আউয়ালের ক্রমাগত হুমকিতে আতঙ্কিত হয়েই তার মা হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেছেন।
একুশে পত্রিকার হাতে আসা নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল ২০২১ সালের ২১শে ডিসেম্বর সওজের নোয়াখালী উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শাখার চাটখিল সড়ক উপ-বিভাগ বরাবর আবাসিক প্রবেশপথের জমির লিজ চেয়ে আবেদন করেন। চাটখিল সড়ক উপ-বিভাগের তৎকালীন সার্ভেয়ার সরেজমিন তদন্ত করে রিপোর্ট দেন যে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০১৫ অনুযায়ী ‘প্রতিটি বসতবাড়ির জন্য একটি প্রবেশপথ দেওয়া যাবে না’। ফলে আবেদনটি আইন পরিপন্থি হওয়ায় ইজারা দেওয়া সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করা হয়।
এত কিছুর পরও ২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর দশ বছরের জন্য ৩ লাখ ২২ হাজার ২০৭ টাকা এককালীন ফি পরিশোধ করে আবাসিক পথ নির্মাণের জন্য ৩.৬৮ শতাংশ অব্যবহৃত জমি ইজারা পেয়ে যান মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল। তবে ইজারা পেলেও আজ পর্যন্ত সেখানে বসতবাড়ির কোনো প্রবেশপথ নির্মাণ করেননি তিনি। ইজারার শর্তে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, ইজারা গ্রহীতা ইজারাকৃত ভূমির অতিরিক্ত কোনো ভূমি ব্যবহার করতে পারবেন না এবং যে উদ্দেশ্যে ভূমি গ্রহণ করেছেন তার বাইরে অন্য কাজে ব্যবহার করলে ইজারা বাতিল ও ফি বাজেয়াপ্ত হবে। কিন্তু বাস্তবে মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল শর্ত ভঙ্গ করে অতিরিক্ত জমি দখলে রেখেছেন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদের চেষ্টা করছেন।
এসব অনিয়মের বিষয়ে কথা বলতে গেলে মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল প্রতিবেদককে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন এবং সহায়তার অনুরোধ জানান। তাতে ব্যর্থ হয়ে কোনো প্রশ্নের সদুত্তর না দিয়েই তিনি স্থান ত্যাগ করেন।
সার্বিক বিষয়ে জানতে নোয়াখালী সওজ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফরিদ উদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে সওজের চাটখিল সড়ক উপ-বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ শফিকুল ইসলামকে কল দেওয়া হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।