
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা বা প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকৃত তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে এক অভূতপূর্ব ও বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত এক দরিদ্র দেশ থেকে আজকের উদীয়মান অর্থনীতির স্থিতিশীল বাংলাদেশ হয়ে ওঠার পেছনে এই পোশাক শিল্পের অবদান অপরিসীম এবং অনস্বীকার্য। গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর, বিশেষ করে লাখ লাখ নারীর কর্মসংস্থানের বিশাল ও যুগান্তকারী সুযোগ তৈরি করে এই শিল্প আমাদের আর্থসামাজিক কাঠামোতে এক জাদুকরী ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের ও উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমানে আমাদের অহংকার ও গর্বের এই তৈরি পোশাক খাত এক নজিরবিহীন অন্ধকারের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। এই ভয়াবহ সংকট কেবল একক কোনো কারণে বা এক দিনে সৃষ্টি হয়নি। বরং সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক বাজারের টালমাটাল অবস্থা এবং দেশের অভ্যন্তরের নানাবিধ কাঠামোগত ও অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার এক অশুভ মেলবন্ধন এই খাতের মজবুত ভিত্তিকে আজ গভীরভাবে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে যে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাত চলছে, তার অত্যন্ত নেতিবাচক ও প্রত্যক্ষ প্রভাব এসে পড়েছে আমাদের দেশের জাতীয় রপ্তানি বাণিজ্যের ওপর। মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল ও ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বিশ্বব্যাপী চলমান অর্থনৈতিক মন্দার কালো ছায়া পোশাক খাতের ওপর রীতিমতো জগদ্দল পাথরের মতো জেঁকে বসেছে। পরিস্থিতি আদতে কতটা ভয়াবহ ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে, তা রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো বা ইপিবি-এর সাম্প্রতিক প্রকাশিত পরিসংখ্যানেই সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
ইপিবি-এর দেওয়া দাপ্তরিক তথ্যানুযায়ী, গত আট মাসে আমাদের পোশাক রপ্তানি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হারে কমেছে, যার পরিমাণ খাতভেদে ৫ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ ও ভীতির জন্ম দিয়েছে গত মার্চ মাসের পরিসংখ্যান। প্রাপ্ত তথ্যমতে, কেবল এক মার্চ মাসেই পোশাক রপ্তানি আয়ে প্রায় ৭৭ কোটি ডলারের এক বিশাল ও অপ্রত্যাশিত পতন পরিলক্ষিত হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে যাওয়া আমাদের উদীয়মান জাতীয় অর্থনীতির সার্বিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য এক ভয়ংকর অশনিসংকেত এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
পোশাক খাতের বর্তমান এই শ্বাসরুদ্ধকর ও হতাশাজনক পরিস্থিতির শেকড় অনুসন্ধান করলে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ধরনের সংকটেরই অকাট্য প্রমাণ মেলে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটটি বর্তমানে অত্যন্ত অস্থিতিশীল ও সংঘাতময়। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরাইল এর মধ্যকার তীব্র উত্তেজনা এবং অন্যদিকে পূর্ব ইউরোপে রাশিয়া ও ইউক্রেনের দীর্ঘস্থায়ী চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল এবং গ্যাসের দাম প্রায় লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জ্বালানির এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বা গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
এর সরাসরি ফলশ্রুতিতে কারখানায় পণ্য উৎপাদন ব্যয় যেমন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, ঠিক তেমনি বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে আসা ক্রয়াদেশগুলোতেও দেখা দিয়েছে চরম স্থবিরতা। আমাদের তৈরি পোশাকের প্রধান দুই বৃহৎ গন্তব্য— যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ এর বাজারে সাধারণ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পশ্চিমা ভোক্তারা এখন পোশাকের মতো বিলাসবহুল বা অগত্যা প্রয়োজনীয় নয় এমন পণ্যের পেছনে ব্যয় ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিচ্ছেন, যার সরাসরি ও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমাদের নতুন ক্রয়াদেশ বা অর্ডার আসার হারের ওপর।
বৈশ্বিক এই মহাসংকটের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেও সমস্যাগুলো ক্রমেই পাহাড়সম রূপ ধারণ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা চরম ডলার সংকট এবং এর ফলে সৃষ্ট এলসি বা ঋণপত্র খোলার জটিলতার কারণে শিল্পের অতি প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন ও সময়মতো সরবরাহ না থাকলে কারখানার উৎপাদন চক্র ব্যাহত হওয়াটা কেবল স্বাভাবিকই নয়, বরং অনিবার্য। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক ঋণের ক্রমবর্ধমান ও উচ্চ সুদের হার। ডলারের অভাব ও ঋণপত্রের এই জটিলতা দ্রুত নিরসন না হলে শিল্পের চাকা ঘোরানো কার্যত সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়বে।
ঠিক এমন একটি চরম সংকটময় ও অস্তিত্ব রক্ষার মুহূর্তে পোশাক রপ্তানিকারকদের শীর্ষ ও প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন বিজিএমইএ শিল্পটিকে যেকোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারের কাছে জরুরি ভিত্তিতে সহায়তা ও হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ৪ হাজার কোটি টাকার বকেয়া প্রণোদনার অর্থ দ্রুত ছাড় করার জোর ও জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক অত্যন্ত জরুরি চিঠিতে বিজিএমইএ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ও তথ্য-প্রমাণসহ জানিয়েছে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ রপ্তানিকারকরা কতটা তীব্র আর্থিক সংকট ও তারল্য সংকটের মধ্যে দিন পার করছেন। একদিকে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, অন্যদিকে বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং পরিবহণ খরচ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় কারখানাগুলো তাদের প্রাত্যহিক উৎপাদন ব্যয় সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। এই মুহূর্তে সরকারের তরফ থেকে বকেয়া প্রণোদনার অর্থ হাতে না পেলে অনেক মাঝারি ও ছোট কারখানার পক্ষেই তাদের উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া এবং সাধারণ শ্রমিকদের নিয়মিত মাসিক মজুরি পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে, যা সমাজে নতুন করে অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে।
তবে আমাদের অত্যন্ত বাস্তববাদী ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ থেকে পুরো পরিস্থিতিটি বিচার ও বিশ্লেষণ করতে হবে। কেবল সাময়িক আর্থিক প্রণোদনা প্রদান বা বকেয়া অর্থ ছাড়করণের মাধ্যমেই এই বিশাল, ব্যাপক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাতের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সাময়িক প্রণোদনা হয়তো কারখানাগুলোকে সাময়িকভাবে টিকে থাকার জন্য একটুখানি অক্সিজেন জোগাবে, কিন্তু টেকসই উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী ও নিখুঁত পরিকল্পনা।
সরকারের পক্ষ থেকে নীতিগত সহায়তার ক্ষেত্রে এখন আরও অনেক বেশি দূরদর্শী, প্রজ্ঞাপূর্ণ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা একান্ত অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। শিল্পের চাকা সচল ও গতিশীল রাখতে সবার আগে কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, এলসি খোলার প্রক্রিয়াকে সহজতর ও বাধামুক্ত করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিশেষ ও কঠোর তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো ধরনের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা যেন কাঁচামাল আমদানিকে বিন্দুমাত্র বিলম্বিত করতে না পারে, সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি প্রয়োজন।
একই সঙ্গে আমাদের নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ীদের এটাও স্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে যে, বৈশ্বিক এই তীব্র মন্দার বাজারে এবং চরম প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক পরিবেশে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে প্রচলিত ধারার গণ্ডিবদ্ধ ব্যবসার বাইরে সাহসিকতার সঙ্গে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের রপ্তানি পণ্যের ঝুড়িতে বৈচিত্র্য আনতে হবে, অর্থাৎ প্রোডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন বা পণ্যের বহুমুখীকরণ বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। যুগের পর যুগ ধরে শুধু সাধারণ মানের সুতির টি-শার্ট, শার্ট বা ট্রাউজারের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে আমাদের চলবে না। বরং হাই-অ্যান্ড বা উচ্চমূল্যের ও অধিক মুনাফাযুক্ত কৃত্রিম তন্তুর পোশাক উৎপাদনের দিকে আমাদের এখনই সর্বাত্মক মনোযোগ ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো আমাদের প্রথাগত বাজারের বাইরে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার নতুন এবং সম্ভাবনাময় বাজারগুলো আবিষ্কার ও সেখানে অনুপ্রবেশের সন্ধানে আমাদের বাণিজ্যিক কূটনীতি, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও সরকারি পর্যায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও অনেক বেশি গতিশীল ও জোরদার করতে হবে।
পরিশেষে, প্রতিটি সচেতন নাগরিক এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের এই অমোঘ সত্য কথাটি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে এবং দৃঢ়ভাবে মনে রাখতে হবে যে, তৈরি পোশাক খাত শুধু আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান হাতিয়ার বা উৎসই নয়; বরং এটি এ দেশের লাখ লাখ খেটে খাওয়া মানুষের, বিশেষ করে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া গ্রামীণ নারী শ্রেণির সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় ও নির্ভরযোগ্য ক্ষেত্র। এই বিশাল শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে দেশের কয়েক কোটি মানুষের জীবন, জীবিকা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ।
তাই আমরা অত্যন্ত বিনীতভাবে ও জোর দিয়ে আশা করি, সরকার বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির গভীরতা, স্পর্শকাতরতা ও অপরিহার্য গুরুত্ব যথাযথভাবে বিবেচনায় নিয়ে শিল্পটি রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রশাসনিক, কাঠামোগত ও নীতিনিষ্ঠ সহায়তা প্রদানে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অত্যন্ত কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এই অতি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পটিকে ধ্বংসের হাত থেকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করা কেবল গুটিকয়েক শিল্পপতি বা ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত মুনাফা বা স্বার্থ রক্ষার কোনো সাধারণ ইস্যু নয়; বরং একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের সামগ্রিক জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বৃহত্তর স্বার্থেই এটি আজ সবচেয়ে বেশি অপরিহার্য ও অলঙ্ঘনীয় কর্তব্য।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।