
বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকস খাতে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা হলো। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে দেশের ইতিহাসের প্রথম বেসরকারি কন্টেইনার বন্দর ‘এমজিএইচ টার্মিনাল’-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। সোমবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) বোর্ড রুমে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই প্রকল্পের চুক্তি স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল মনিরুজ্জামান এবং এমজিএইচ গ্রুপের সিইও আনিস আহমেদসহ সংশ্লিষ্ট খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই টার্মিনাল বাংলাদেশের সাপ্লাই চেইন অবকাঠামোতে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
সাত একর জমির ওপর নির্মিত এই টার্মিনালে রয়েছে ২৫০ মিটারের একটি জেটি। এটি ৩ হাজার ৫০০ টিইইউএস (TEUs) কন্টেইনার ধারণ করতে সক্ষম এবং মাসে প্রায় ৪০ হাজার টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার খালাস ক্ষমতা মাসিক ১০২টি জাহাজ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের ক্রমবর্ধমান আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ব্যাপক গতিশীলতা যোগ করবে।
এমজিএইচ টার্মিনালটি বাংলাদেশের প্রথম ‘গ্রিন পোর্ট’ বা পরিবেশবান্ধব বন্দর হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এটি সম্পূর্ণ ‘জিরো-এমিশন’ বা শূন্য-নির্গমন নীতিতে পরিচালিত হবে। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য ব্যবহৃত সব সরঞ্জাম এবং প্রাইম মুভারগুলোর বিদ্যুৎচালিত ব্যবস্থা। এছাড়া সোলার রোড প্যানেল এবং সোলার ফেন্সিংয়ের মাধ্যমে এখানে নবায়নযোগ্য শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। এমজিএইচ কর্তৃপক্ষ বলছে, এই আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বছরে প্রায় ২ হাজার ৭০০ টন কার্বন নির্গমন হ্রাস করা সম্ভব হবে।
জানা গেছে, এই টার্মিনালটির অবস্থানগত সুবিধার কারণে মোহনা থেকে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে জাহাজ বন্দরে ভিড়তে পারবে। বর্তমানে মূল চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ ভিড়তে যেখানে প্রায় ২ ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে এমজিএইচ টার্মিনাল জাহাজপ্রতি অন্তত দেড় ঘণ্টা সময় বাঁচাবে। এতে প্রতিটি জাহাজ দশমিক ৬ থেকে ১ দশমিক ৩ টন পর্যন্ত জ্বালানি সাশ্রয় করতে পারবে, যা আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলোর জন্য বড় অর্থনৈতিক স্বস্তি বয়ে আনবে।
এমজিএইচ গ্রুপের সিইও আনিস আহমেদ জানান, সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এই আধুনিক টার্মিনালটি নির্মাণ করা হয়েছে। আনিস আহমেদ বলেন, তাঁদের লক্ষ্য হলো সর্বোচ্চ দক্ষতা নিশ্চিত করা। তাঁরা কেবল কন্টেইনার স্থানান্তর করছেন না, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দ্রুতগতির পথে এগিয়ে নিতে কাজ করছেন।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল মনিরুজ্জামান এই উদ্যোগকে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে বলেন, বেসরকারি খাতের দক্ষতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির এই সমন্বয় আমাদের রপ্তানি খাতকে বিশ্ববাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২৬টি দেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী এমজিএইচ গ্রুপের এই উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আধুনিক ও দক্ষ অর্থনীতি গড়ার রূপকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি এই প্রকল্প কয়েক হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রাখবে।