
চট্টগ্রামের বাতাসে তখনও ক্রিকেটের উত্তেজনা মিলিয়ে যায়নি। বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান স্টেডিয়ামের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে বসে শন টেইট যখন কথা বলছিলেন, তখন বারবার একটাই নাম ফিরে আসছিল — নাহিদ রানা। প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ডের মিডিয়া ম্যানেজার ক্যালাম কর্নয়ে সকালেই বলে গেছেন, “ছেলেটা সত্যিকারের একটা প্রতিভা।” ঘণ্টা দুয়েক পর নিউজিল্যান্ডের পেসার উইল ও’রুর্কের কণ্ঠেও একই সুর। আর এখন নিজের দলের পেস বোলিং কোচ— অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ভয়ঙ্কর পেসার শন টেইট— বসেছেন মাইক্রোফোনের সামনে। বলতে গেলে পুরো সংবাদ সম্মেলনটাই হয়ে গেল নাহিদময়।
যখন প্রতিপক্ষও থমকে যায়
ক্রিকেটে প্রশংসার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হয়তো এটাই— প্রতিপক্ষ যখন নিজে থেকে এসে বলে, “এই ছেলেটাকে সামলানো কঠিন।” নিউজিল্যান্ডের শিবির থেকে সেই স্বীকৃতি আসার পর বাংলাদেশের পেস বোলিং কোচের কাছে প্রশ্নগুলো যাচ্ছিল একের পর এক। নাহিদ কি আরও নতুন অস্ত্র যোগ করছেন? টানা তিন ম্যাচ খেলানো যাবে? চোটের ঝুঁকি নেই তো?
টেইট প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিলেন— কিন্তু একটু অন্যভাবে। উৎসাহের চেয়ে সতর্কতাই বেশি ছিল তাঁর কণ্ঠে।

গতিই যখন সবচেয়ে বড় অস্ত্র
দ্বিতীয় ওয়ানডেতে নাহিদ রানা যা করেছেন, সেটা সংখ্যায় বললে এরকম— ১০ ওভারের পুরো স্পেলে মাত্র একটি বল করেছেন ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারের নিচে। উইকেট নেওয়া পাঁচটি বলের একটিও ছিল না ১৪১ কিলোমিটারের কম গতিতে। ফুল লেংথে একটি, বাউন্সারে তিনটি, ইয়র্কারে একটি— বৈচিত্র্য ছিল, কিন্তু মূল অস্ত্র ছিল সেই নিষ্ঠুর গতি।
আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ফাস্ট বোলারদের মধ্যে স্লোয়ার বল, কাটার, নাকল বলের হিড়িক। কিন্তু টেইট সাফ বলে দিলেন, নাহিদের এখনই এসব ভাবার দরকার নেই। তাঁর যুক্তিটা বেশ পরিষ্কার— যাঁরা ১৩০ কিলোমিটার গতিতে বল করেন, তাঁদের স্লোয়ার বল ছাড়া উইকেট নেওয়ার পথ সংকীর্ণ। কিন্তু যে বোলারের হাতে ১৪৫ কিলোমিটারের বাউন্সার আছে, তার কাছে স্লোয়ার বল এখন বিলাসিতামাত্র।
ওয়াকার ইউনুসের স্মৃতি
সংবাদ সম্মেলনে টেইটের চোখ একটু অন্যরকম হয়ে গেল যখন নাহিদের ইয়র্কারের প্রসঙ্গ এল। “গত ম্যাচে নাহিদের যেটা সবচেয়ে ভালো লেগেছে, সেটা ইয়র্কার। আমাকে ওয়াকার ইউনুসের দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।”— সাবেক এই অস্ট্রেলিয়ান পেসারের এই কথাটুকুই বলে দেয়, নাহিদকে নিয়ে তিনি কোথায় দাঁড়িয়ে ভাবছেন।
ওয়াকার ইউনুস— পাকিস্তানের সেই কিংবদন্তি, যিনি টপ অর্ডার ভাঙতেন তীব্র গতিতে আর লেজের ব্যাটসম্যানদের গুটিয়ে দিতেন মারণ ইয়র্কারে। নাহিদের মধ্যে সেই একই ছন্দ দেখছেন টেইট।
কোচের চোখে একজন ‘সম্পদ’
নাহিদকে টেইট শুধু প্রতিভা বলেননি, বলেছেন “বাংলাদেশ ক্রিকেটের সম্পদ।” এই শব্দটা হালকা নয়। নিজের খেলোয়াড়ি জীবনের সঙ্গে তুলনা টানতে গিয়ে টেইট বরং নিজেকেই ছোট করলেন— “সে খুব ফিট, আমি এতটা ছিলাম না। আমার শরীর ভারী ছিল, জোরে বল করা কঠিন ছিল। কিন্তু তাকে দেখে মনে হয় কাজটা খুব সহজ— সে খুব ভালো অ্যাথলেট, পাতলা আর শক্তিশালী। আমার চেয়ে তার চোটে পড়ার ঝুঁকি কম।”
একজন কোচের কাছ থেকে এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে?
উইকেট, মোস্তাফিজ এবং আত্মবিশ্বাস
শুধু নাহিদ নন, টেইট চট্টগ্রামের উইকেট নিয়েও আশাবাদী। কিউরেটরের সঙ্গে কথা বলে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে পিচ খেলার উপযোগী থাকবে। মোস্তাফিজুর রহমান অনুশীলনে বল করেছেন, ফিট আছেন— তবে একাদশে থাকবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত নির্বাচকদের।
তানজিম হাসান সাকিব, হাসান মাহমুদের মতো তরুণরা বিপিএল ও ইমার্জিং ক্রিকেটের পথ ধরে জাতীয় দলে এসেছেন। তাদের এই তারুণ্য আর প্রাণশক্তি দলকে ভেতর থেকে বদলে দিচ্ছে বলে বিশ্বাস করেন টেইট।
সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচের আগে চাপের কথা জিজ্ঞেস করা হলে টেইট হাসলেন। বললেন, দল এখন ফুরফুরে মেজাজে আছে। সিনিয়রদের অনুপস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাতে তাঁরা রাজি নন। জেতার ব্যাপারে তাঁরা ভীষণ আশাবাদী।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে যখন তৃতীয় ওয়ানডে শুরু হবে, মাঠের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকবেন নাহিদ রানা। রান-আপ নেবেন। বলটা ছাড়বেন। আর সেই মুহূর্তে প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানের মাথায় ঘুরতে থাকবে একটাই ভয়— এবার কোথায় পড়বে বলটা?
গতির এই আগুন এখনই নেভানোর কোনো কারণ নেই। শন টেইটও চান না।