
‘টোব্যাকো কোম্পানির সিন্ডিকেটে দিশেহারা চকরিয়ার ১২ হাজার তামাক চাষি, সড়কে বিক্ষোভ’ শিরোনামে একুশে পত্রিকায় গত ২৪ এপ্রিল একটি সংবাদ প্রকাশের পর একদিনের মধ্যেই তামাক চাষিদের দুর্ভোগ লাঘবে এগিয়ে এসেছেন চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার।
প্রকাশিত সংবাদের বিষয়টি আমলে নিয়ে ইউএনও শাহীন দেলোয়ার শনিবার বেলা ১১টায় চকরিয়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে উপজেলায় নিয়োজিত ব্রিটিশ আমেরিকান, আকিজ টোব্যাকো, আবুল খায়ের টোব্যাকো, জাপান টোব্যাকোসহ আরও কয়েকটি কোম্পানির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডেকে পাঠিয়ে জরুরি বৈঠক করেন। এই বৈঠকে তামাক চাষিদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে পাশে থাকা সুরাজপুর মানিকপুর ইউনিয়নের তরুণ রাজনীতিবিদ সাইফুল কবির চৌধুরী এবং স্থানীয় দুই শতাধিক তামাক চাষি উপস্থিত ছিলেন। এর আগেই চাষিদের অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চকরিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি এনামুল হক ইউএনওকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
বৈঠকে তামাক চাষিদের অভিযোগের বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ইউএনও শাহীন দেলোয়ার। তিনি জানান, তামাক চাষিদের সমস্যা নিয়ে প্রকাশিত সংবাদটি নজরে আসার পর করণীয় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট টোব্যাকো কোম্পানির লোকজনকে চকরিয়া উপজেলা পরিষদে আসতে বলা হয় এবং একদিনের নোটিশে এই জরুরি বৈঠক ডাকা হয়।
বৈঠকে টোব্যাকো কোম্পানির প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে তামাক চাষিদের অভিযোগ ও আপত্তিগুলো নোট করা হয়। এরপর টোব্যাকো কোম্পানির প্রতিনিধিদের বক্তব্য শোনা হয়। পরিশেষে সবার মতামতের ভিত্তিতে কোম্পানি কর্তৃক চুক্তি অনুযায়ী ন্যায্য মূল্যে তামাক পাতা ক্রয় করার সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা হয়। সেই ক্ষেত্রে টোব্যাকো কোম্পানিগুলো নিয়ম মোতাবেক তামাকের গ্রেড বা কোয়ালিটি অনুযায়ী পাতা ক্রয় করবে।
এ ছাড়া বৈঠকে উৎপাদিত তামাক চাষির নিজস্ব গুদাম বা মোকাম থেকে টোব্যাকো কোম্পানিকে ক্রয়ের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ সময় সব টোব্যাকো কোম্পানি এতে রাজি হলেও শুধুমাত্র ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানির প্রতিনিধি তাদের সিনিয়র অফিসারদের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, চকরিয়া উপজেলার সুরাজপুর মানিকপুর, কাকারা ও বমুবিলছড়ি ইউনিয়নের কমপক্ষে ১২ হাজার তামাক চাষি দুই যুগের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে আগাম চুক্তির ভিত্তিতে তামাক উৎপাদন করে আসছেন। চুক্তি অনুযায়ী মৌসুম শেষে নির্ধারিত মূল্যে তামাক কেনার কথা থাকলেও এ বছর হঠাৎ করে ‘গ্রেড ভালো নয়’ অজুহাত দেখিয়ে কোম্পানির স্থানীয় প্রতিনিধিরা তামাক নিচ্ছিলেন না। এতে চাষিরা উৎপাদিত তামাক ঘরে বা অস্থায়ী গুদামে রেখে নষ্ট হওয়ার শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছিলেন।
এই অবস্থায় তামাকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতের দাবিতে গত বৃহস্পতিবার রাতে চকরিয়া-মানিকপুর সড়কে বিক্ষোভ করেন হতাশাগ্রস্ত তামাক চাষিরা। এ সময় বিক্ষোভের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান তরুণ রাজনীতিবিদ সাইফুল কবির চৌধুরী। তিনি ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ শোনেন এবং বিষয়টি চকরিয়া উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের আশ্বাস দেন।
সাইফুল কবির চৌধুরী বলেন, চকরিয়ার অন্তত ১২ হাজার কৃষক দীর্ঘদিন ধরে তামাক চাষের সঙ্গে জড়িত এবং তারা আগে থেকেই আকিজ, আবুল খায়ের, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোসহ বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে মূল্য নির্ধারণ করে চাষ করেন। কিন্তু এবার তামাক কেনার সময় এসে স্থানীয়ভাবে সিন্ডিকেট করে কম দামে কেনার চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান। সাইফুল কবির চৌধুরী আরও উল্লেখ করেন, চুল্লিতে পোড়ানো শেষে তামাকের বান্ডিল বাইন সেন্টারে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও নানা অজুহাতে কোম্পানিগুলো তা গ্রহণ করছে না, ফলে তামাক নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
একাধিক চাষি জানান, জমি বর্গা, সার, কীটনাশক ও শ্রমিক মজুরি—সবকিছুর খরচ এ বছর প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অথচ এখন তামাকের মান খারাপ বলে দাবি করে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এভাবে চললে পথে বসতে হবে বলে কৃষকরা জানান।
কাকারা ইউনিয়নের বাসিন্দা ও চকরিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মাহমুদুর রহমান মাহমুদ বলেন, এই তিন ইউনিয়নের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের জীবিকা তামাক চাষের ওপর নির্ভরশীল। নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশগত ক্ষতির মাঝেও মানুষ পরিবার টিকিয়ে রাখতে এই চাষ করে। এখন ন্যায্য দাম না পেলে তারা চরম বিপদে পড়বেন বলে মাহমুদুর রহমান মাহমুদ আশঙ্কা প্রকাশ করেন।