সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

আলীকদমে পাহাড় কেটে ন্যাড়া, ২০০ একর বনভূমি সাবাড়

এম. জিয়াবুল হক | প্রকাশিতঃ ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ৭:৫২ অপরাহ্ন


আলীকদম থেকে ফিরে: বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার তৈন রেঞ্জের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় জোত পারমিটের আড়ালে নির্বিচারে গাছ কেটে ২০০ একর বনভূমি উজাড়ের অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার মাংগু মৌজার ‘ব্যাঙ ঝিড়ি’ নামক এলাকায় পাহাড় কেটে মাটি লুট ও শতবর্ষী মাতৃগাছ কাটার কারণে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। গাছ কাটার কারণে পানির উৎস শুকিয়ে যাওয়ায় ওই এলাকার সাত-আটটি ম্রো পাড়ায় হাহাকার শুরু হয়েছে।

আলীকদম-থানচি সড়কের ১৭ কিলোমিটার দূরে চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পামিয়া ম্রো পাড়া, তন্তুই পাড়া, নামচাক পাড়া, কাকই পাড়া ও আদুই পাড়াসহ আশপাশের এলাকায় এই ধ্বংসযজ্ঞ চলছে।

ব্যাঙ ঝিরির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ করে পাহাড় কেটে ট্রাক চলাচলের রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। যন্ত্রচালিত করাত দিয়ে প্রতিনিয়ত গাছ কাটা হচ্ছে। গর্জন, চাম্পা, কড়ই, বৈলাম, গুটগুটিয়া, লালি ও চাপালিশসহ নানা প্রজাতির বনজ গাছ কেটে সড়কে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে এসব গাছ পাচার করা হচ্ছে এবং ডালপালা অবৈধ ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, আলীকদম পান বাজারের বাসিন্দা আবু হান মো. ইসমাইল এই বন নিধন সিন্ডিকেটের মূল হোতা। তার সহযোগী হিসেবে আছেন লংলেইন ম্রো। তাদের নেতৃত্বে অন্তত ৩০ জনের একটি চক্র গাছ কেটে পাচার করছে।

আদুই পাড়ার কার্বারি কামপ্লাত ম্রো বলেন, “এই ঝিড়ির পানির ওপর আমাদের সাত-আটটি পাড়া নির্ভরশীল। বন উজাড় হওয়ায় ঝিড়ি শুকিয়ে গেছে। এখন আমরা পানির জন্য হাহাকার করছি। প্রশাসনে জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি।”

নামচাক পাড়ার বাসিন্দা মেন রাও ম্রো আক্ষেপ করে বলেন, “আগে এই বনে হরিণ, ভালুক আর বন্য শূকর দেখা যেত। এখন বন নেই, প্রাণীও নেই। দীর্ঘদিন ধরে ইসমাইল নামের ওই ব্যক্তি সব গাছ কেটে মরুভূমি বানিয়ে ফেলেছেন।”

গাছ কাটার তদারকিতে থাকা শ্রমিক সরদার ইসমাইল জানান, সওদাগর ইসমাইলের নির্দেশে তারা করই, চাপালিশ ও গামারি গাছ কাটছেন এবং দুটি ট্রাক দিয়ে এসব গাছ আলীকদমে নেওয়া হচ্ছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আবু হান মো. ইসমাইল বলেন, “পাহাড় কেটে যারা রাস্তা তৈরি করেছে, তারাই বড় গাছ কেটেছে। তারা থানচি এলাকার গাছ ব্যবসায়ী। শুধু লাকড়ি সংগ্রহ করতে গিয়ে শেষের দিকে এসে আমি জড়িয়ে গেছি। এটা আমার বড় ভুল হয়েছে। আমি লাকড়িগুলো আলীকদমের ইটভাটা ও তামাকের চুল্লিতে বিক্রি করি।”

আলীকদম তৈন রেঞ্জ কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলাম দাবি করেন, যেখান থেকে গাছ কাটা হচ্ছে, সেই এলাকায় বন বিভাগের কোনো কার্যক্রম নেই। তবে অবৈধ কাঠ পাচারের প্রমাণ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম বলেন, “বিষয়টি ইতোমধ্যে আমি অবগত হয়েছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে পুলিশ নিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বন নিধনের ঘটনাস্থলটি বন বিভাগের বাইরে থাকলেও গাছ এবং পাহাড় কাটার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।