
চলন্ত বর্জ্য চট্টগ্রাম শহরকে দূষিত করছে। চরম অব্যবস্থাপনা এর মূল কারণ। সড়কজুড়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের যে গাড়িগুলো ছুটছে ডাম্পিং স্টেশনের উদ্দেশ্যে, সেগুলো ছড়াচ্ছে দূষণ। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বর্জ্য নিয়ে ছুটে চলা এই গাড়িগুলো থেকে বর্জ্য ছড়াচ্ছে সড়কেই। এর ফলে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। সেখান থেকে নির্গত জীবাণু আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
প্রতিদিন শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ময়লা-আবর্জনা খোলা ট্রাক বা অপর্যাপ্তভাবে ঢেকে রাখা যানবাহনে করে ডাম্পিং স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। এই যাত্রাপথে বাতাসে উড়ে বা গাড়ির ঝাঁকুনিতে ময়লা রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে।
বর্ষায় এই আবর্জনাগুলো নর্দমা ও ড্রেনগুলোতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে। এই ‘চলন্ত দূষণ’ শুধু পরিবেশের সৌন্দর্য নষ্ট করছে না; এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা রোগব্যাধির একটি প্রধান কারণ।
জীবাণুর বিস্তার ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
এই ছড়িয়ে পড়া বর্জ্য থেকে বিভিন্ন ক্ষতিকর জীবাণু বাতাসে মিশে যায়। বিশেষ করে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ফাঙ্গাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে নানা রোগের কারণ হতে পারে।
উল্লেখযোগ্য রোগগুলোর মধ্যে রয়েছে:
১. পাচনতন্ত্রের রোগ: দূষিত পরিবেশ ও পানির মাধ্যমে সহজেই ডায়রিয়া ও আমাশয় ছড়ায়।
২. শ্বাসকষ্ট: বাতাসে ভাসমান জীবাণু ও ধূলিকণা ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায়।
৩. চর্মরোগ: ময়লা ও দূষিত পানির সংস্পর্শে চর্মরোগ বৃদ্ধি পায়।
৪. মশাবাহিত রোগ: জমে থাকা বর্জ্যে পানি জমে মশার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি হয়ে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে।
বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন মানুষের জন্য এই ঝুঁকি আরও বেশি। তাছাড়া অব্যবস্থাপিত মেডিক্যাল বর্জ্যের মাধ্যমে সহজেই ছড়াতে পারে হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি এবং এইচআইভি/এইডস। বিশেষ করে ব্যবহৃত সুচ বা ধারালো বস্তু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
পরিবেশগত প্রভাব
বর্জ্যের এই অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার শুধু মানুষের শরীরেই নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। প্লাস্টিক ও রাসায়নিক বর্জ্য মাটির উর্বরতা কমায় এবং ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষিত করে। জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে এবং শহরের বাসযোগ্যতা কমে যায়। মেডিক্যাল বর্জ্যের ক্ষতিকর রাসায়নিক ও জীবাণু মিশে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। জীবাণুগুলো ওষুধ-প্রতিরোধী (রেজিস্ট্যান্ট) হয়ে ওঠে, ফলে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হ্রাস পায়।
প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা ও করণীয়
বাংলাদেশের নগর জীবনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশনের ময়লা পরিবহনের সময় এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যেতে যেতে রাস্তাজুড়ে আবর্জনা ছড়িয়ে পড়ার যে চিত্র আমরা প্রায়ই দেখি, তা শুধু দৃষ্টিকটু নয়—এটি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব হুমকি। নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সংগ্রহ, পরিবহন ও নিষ্পত্তি—এই তিনটি ধাপ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের শহরগুলোতে পরিবহনের ধাপেই বড় ধরনের ত্রুটি দেখা যায়। অপরিকল্পিত রুট, অনিয়মিত সময়সূচি এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে বর্জ্য পরিবহনের সময় তা ছড়িয়ে পড়ে। এই সমস্যার সমাধান একদিনে সম্ভব নয়, তবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
এজন্য জরুরি:
১. আধুনিক বর্জ্য পরিবহন ব্যবস্থা: সম্পূর্ণ ঢাকনাযুক্ত ও লিক-প্রুফ যানবাহন (কম্প্যাক্টর ট্রাক) ব্যবহার।
২. রুট ও সময় ব্যবস্থাপনা: নির্দিষ্ট সময়ে বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবহন নিশ্চিত করা।
৩. বর্জ্য পৃথকীকরণ ও রিসাইক্লিং: উৎসস্থলেই বর্জ্য আলাদা করার ব্যবস্থা ও বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন করা। জীবাণুমুক্তকরণ ও ধ্বংস প্রক্রিয়া অনুসরণ করা।
৪. কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতা: সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি অর্থাৎ ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা।
৫. অর্থসংস্থান: এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটিতে দক্ষ জনবল ও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা।
৬. জনসচেতনতা বৃদ্ধি: স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। বিশেষ করে পাঠ্যপুস্তকে এ ব্যাপারে সচেতনতামূলক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা।
একটি শহরের পরিচ্ছন্নতা তার সভ্যতার প্রতিফলন। চলন্ত অবস্থায় বর্জ্য ছড়িয়ে পড়া একটি ছোট সমস্যা মনে হলেও এর প্রভাব বহুমাত্রিক এবং সুদূরপ্রসারী। একটি পরিচ্ছন্ন শহর কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি সুস্থ জীবনের পূর্বশর্ত। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এই চলমান ত্রুটিগুলো দ্রুত সমাধান না করলে তা ভবিষ্যতে আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই এখনই সময় সচেতন হওয়ার, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার এবং একটি বাসযোগ্য, সুস্থ নগর গড়ে তোলার।
লেখক: প্রফেসর ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান—প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ এবং প্রফেসর ড. ইকবাল সারোয়ার—ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।