সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

কাছের মানুষ যখন ঘাতক

সাইফুল আযম | প্রকাশিতঃ ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:২৬ অপরাহ্ন


অজানা, অতি গোপন বা ধোঁয়াশাপূর্ণ কোনো বিষয়কে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণের (যেমন- ডিএনএ) মাধ্যমে মানুষের সামনে নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করাকেই মূলত রহস্য উন্মোচন বলে। বিশিষ্ট ইউটিউবার সুজয় নীল-এর বর্ণিত একটি বাস্তব ঘটনার আলোকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাক।

আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগের কথা। তখন প্রযুক্তি বা ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহের এত উন্নত ব্যবস্থা ছিল না। সে সময় এক ওষুধের দোকানদার তার স্ত্রীকে হত্যা করে। এরপর মৃতদেহ টুকরো টুকরো করে তৎকালীন জনপ্রিয় সংবাদপত্র ‘যুগান্তর’-এ মুড়িয়ে, নারকেলের দড়ি দিয়ে বেঁধে রাতের অন্ধকারে রাস্তার আশেপাশের বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেয়। চেনা না যায়, সেজন্য তার আগে নিহতের মাথা, চোখ, কান, নাক ও মুখের চামড়া বঁটি দিয়ে বিকৃত করে দেওয়া হয়েছিল।

পরদিন সকালে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা কাগজে মোড়ানো মানুষের দেহের একটি অংশ দেখতে পান। কিছুক্ষণ পর অন্য এক জায়গায় আরও কয়েকটি প্যাকেট পাওয়া যায়। এক পথচারী তা দেখে ভয়ে চিৎকার শুরু করলে সেখানে শত শত মানুষের ভিড় জমে যায়। খবর পৌঁছে যায় থানায়। এদিকে অন্য একটি থানা থেকেও খবর আসে যে, তারা দুই-তিন মাসের একটি মানবভ্রূণ উদ্ধার করেছে। এরপর পুলিশের সন্দেহের তালিকা দীর্ঘ হতে থাকে।

তদন্তের দায়িত্ব পড়ে এক পুলিশ কর্মকর্তার ওপর। দুই মাস পার হলেও কোনো কূলকিনারা না পাওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাকে অদক্ষ আখ্যা দিয়ে ক্রমাগত চাপ দিতে থাকে। কিন্তু অফিসার ছিলেন নাছোড়বান্দা। এক শীতের রাতে, তীব্র ঠান্ডায় ক্লান্ত ও অসুস্থ শরীরে তিনি গাড়ি থামিয়ে একটি ওষুধের দোকানে যান। ঘন ঘন কাশি হওয়ায় তিনি একটি কাশির সিরাপ চান। দোকানের কর্মচারী এদিক-ওদিক তাকিয়ে জানায়, দোকানে কোনো কাশির সিরাপ নেই। অবাক হয়ে অফিসার ধমকের সুরে বলেন, সামান্য একটি কাশির সিরাপ না থাকলে এই ফার্মেসি রাখার দরকার কী? কর্মচারী তখন জানায়, গত দুই মাস ধরে দোকানের মালিক আসেন না, তাই এই দশা। অফিসার মালিকের নাম জানতে চাইলে কর্মচারী তা বলে দেয়।

গাড়িতে ওঠার পর অফিসারের মনে খটকা লাগে। তিনি ড্রাইভারকে পাঠিয়ে মালিকের নাম-ঠিকানা আবার নিশ্চিত হন। এরপর সোজা সেই মালিকের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, গত দুই মাস ধরে বাড়িটি তালাবদ্ধ। পুলিশের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। একদিন ভোরে এক এলাকায় অভিযান চালানোর সময় পুলিশ দেখতে পায়, এক ব্যক্তি সাদা গামছায় মুখ লুকিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। পুলিশ তার নাম জিজ্ঞাসা করলে সে নিজের নাম বলে। স্ত্রীর কথা জানতে চাইলে লোকটি জানায়, তার স্ত্রী অন্য একজনের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ায় লজ্জায় সে এলাকা ছেড়েছে। পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে যায়। প্রথমে নরম সুরে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও পরে কঠোর শাস্তির ভয় দেখালে সে সব সত্য গড়গড় করে বলে দেয়। এভাবেই ধরা পড়ে আসল খুনি।

এবার আসা যাক বাস্তব কিছু ঘটনা প্রসঙ্গে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রনায়ক থেকে শুরু করে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি তাদের খুব কাছের মানুষদের দ্বারাই হত্যার বা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলা, টিপু সুলতান থেকে শুরু করে ইন্দিরা গান্ধীর মতো অনেকেই কাছের মানুষের বিশ্বাসভঙ্গের কারণে প্রাণ হারিয়েছেন।

আমাদের সমাজেও এমন কিছু মানুষ আছে, যারা মুখে আপনার জন্য জীবন দেওয়ার কথা বললেও সুযোগ পেলে পেছন থেকে ক্ষতি করতে দ্বিধা করে না। এরা সামনে প্রশংসা করলেও পেছনে দুর্নাম রটায় এবং ক্ষতি করার নীল নকশা তৈরি করে। তাই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে অতি কাছের মানুষদের অন্ধভাবে বিশ্বাস করার আগে সতর্ক থাকা জরুরি।

যুগ অনেক পাল্টেছে। প্রযুক্তির কল্যাণে প্রশাসন এখন সহজেই অপরাধীর গতিবিধি ট্র্যাক করতে পারে। তাই কেউ চুপচাপ বা নিরীহ হয়ে আছে মানেই সে নির্দোষ—এমনটা ভাবা বোকামি। কেউ অকারণে মিষ্টি কথা বললে বা সহযোগিতা করতে এলেই তার পেছনে কোনো বিশাল নীল নকশা লুকিয়ে থাকতে পারে। সুতরাং, সবাইকে চোখ-কান খোলা রেখে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

এই লেখাটি কাউকে ছোট করার জন্য নয়, বরং গণসচেতনতা তৈরি ও সতর্ক করার উদ্দেশ্যে লেখা। সবাই ভালো থাকবেন, বন্ধু নির্বাচনে সতর্কতা অবলম্বন করবেন। ধন্যবাদ।

লেখক: সহকারী শিক্ষক, কাইচতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বান্দরবান সদর।