চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার হাইলধর ইউনিয়নের সবুজ ধানক্ষেতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা নীল সোলার প্যানেলগুলো শুধু একটি প্রযুক্তিগত স্থাপনা নয়—এগুলো বাংলাদেশের কৃষি ভবিষ্যতের এক উজ্জ্বল প্রতীক। গত ২২ এপ্রিল একুশে পত্রিকায় ‘সূর্যের আলোয় সোনার ফসল’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আনোয়ারার এই অভাবনীয় পরিবর্তনের কথা। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) উদ্যোগে স্থাপিত এই সৌরশক্তিচালিত সেচ পাম্প আজ যে নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে, তার তাৎপর্য বুঝতে হলে আমাদের তাকাতে হবে কৃষকের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণার ইতিহাসের দিকে।
সেই যন্ত্রণা আজ আরও তীব্র হয়েছে বিশ্বরাজনীতির অস্থিরতায়। ইরান যুদ্ধের ছায়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম যখন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তখন তার আঁচ সরাসরি লাগছে বাংলাদেশের প্রান্তিক কৃষকের পকেটে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিং, আর সেচের অনিশ্চয়তা—এই ত্রিমুখী চাপে দেশের কৃষি উৎপাদন আজ এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন। প্রতি কানি জমিতে ডিজেল পাম্পে ২৫০০-৩০০০ টাকা, বিদ্যুৎ পাম্পে ২২০০ টাকা—এই বিপুল খরচ বহন করে চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়া ছোট কৃষকের পক্ষে কতটা দুঃসাধ্য, তা শুধু ভুক্তভোগীই জানেন।
এমন এক বাস্তবতায় আনোয়ারার সোলার সেচ প্রকল্প যেন আশার এক প্রদীপ। মাত্র ১৬০০ টাকায় প্রতি কানি জমিতে সেচের ব্যবস্থা—অর্থাৎ ডিজেলের তুলনায় প্রায় ৯০০ থেকে ১৪০০ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয়। হিসাবটি শুনতে সাধারণ মনে হলেও, একজন কৃষকের পরিবারে দশ-বারো কানি জমির হিসাব ধরলে এক মৌসুমে দশ-পনেরো হাজার টাকার সঞ্চয় যে কী বিরাট পার্থক্য তৈরি করে, তা ভাষায় বোঝানো কঠিন। এই টাকা ফিরে যাচ্ছে ভালো বীজে, উন্নত সারে, সন্তানের পুষ্টিকর খাবারে, কিংবা মেয়ের বইখাতায়।
খরচের হিসাব ছাপিয়ে এই প্রকল্পের সবচেয়ে কাব্যিক দিকটি অবশ্য এর নিঃশব্দতা। প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত সূর্যের আলো নিঃশব্দে রূপান্তরিত হয় বিদ্যুতে, আর সেই বিদ্যুৎ পরিণত হয় ফসলের মাঠের পানিতে। কোনো ধোঁয়া নেই, কোনো শব্দ নেই, কোনো জ্বালানির ঝামেলা নেই। ১.৫ কিউসেক ক্ষমতার একটি পাম্প একাই দশ হেক্টর জমির তৃষ্ণা মেটাতে সক্ষম। প্রকৃতি ও প্রযুক্তির এমন সহাবস্থান বাংলাদেশের গ্রামীণ ভূদৃশ্যে এক নতুন সৌন্দর্য যোগ করেছে।
এই নীরব রূপান্তরের প্রভাব শুধু খরচ ও পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়—তা পৌঁছেছে কৃষকের মনের গভীরে। হাইলধরের কৃষক সাইফুল ইসলামের কথায় যে স্বস্তির সুর শোনা যায়, সেটিই এই প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্যের পরিমাপক। মোটর পুড়ে যাওয়ার আতঙ্ক নেই, ডিজেলের জন্য বাজারে ছোটার তাড়া নেই, লোডশেডিংয়ের অভিশাপ নেই—শুধু আছে নিশ্চিত পানি সরবরাহের আশ্বাস। এই মানসিক স্থিরতা কৃষককে দিচ্ছে তিন ফসলি চাষের সাহস, পরিকল্পনার দূরদৃষ্টি।
তবে এই সাফল্যকে স্থানীয় কয়েকটি ইউনিয়নের সীমানায় আটকে রাখলে চলবে না। আনোয়ারার দুটি স্কিমে যে বিশ হেক্টর জমি উপকৃত হচ্ছে, তা বাংলাদেশের বিশাল কৃষিভূমির তুলনায় সমুদ্রে এক বিন্দু জলের মতোই। এই মডেলকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হলে চাই সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ। সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদানে, যাতে আগ্রহী কৃষকরা সমিতি গঠন করে নিজ উদ্যোগেই সোলার পাম্প স্থাপন করতে পারেন। বেসরকারি খাতকে এই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিতরণে সম্পৃক্ত করতে হবে; প্রয়োজন হবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থানীয় দক্ষ জনবল তৈরির পরিকল্পনাও।
কেবল কৃষির স্বার্থেই নয়, জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য জ্বালানির ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন কেবল অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তারও প্রশ্ন। প্রতিটি সোলার পাম্প মানে বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়, ডিজেল আমদানিতে চাপ কমানো, এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে এক ছোট্ট অবদান। লক্ষ লক্ষ এমন ছোট অবদান মিলেই গড়ে উঠতে পারে এক টেকসই কৃষিব্যবস্থা।
আনোয়ারার মাঠে যে নীল প্যানেলগুলো এখন রোদে চকচক করে, সেগুলো আসলে বাংলাদেশের কৃষির এক নতুন অধ্যায়ের প্রচ্ছদ। কৃষকের কপালের ঘাম, জ্বালানি সংকটের যন্ত্রণা, আর লোডশেডিংয়ের অসহায়তা—এই তিনের বিরুদ্ধে সূর্যই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র। বিএডিসির এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন কৃষকের প্রকৃত সমস্যাকে কেন্দ্র করে কাজ করে, তখন বদলটা শুরু হয় মাঠের মাটি থেকেই। এখন প্রয়োজন এই বিপ্লবকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া—দেশের প্রতিটি জেলায়, প্রতিটি উপজেলায়, প্রতিটি ইউনিয়নে। সূর্য তো প্রতিদিনই ওঠে; প্রশ্ন হলো, আমরা সেই আলোকে কতটা কাজে লাগাতে পারছি। আনোয়ারার কৃষকরা সেই উত্তর দিতে শুরু করেছেন। এবার দায়িত্ব আমাদের—নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা, এবং নাগরিক সমাজের—এই সোনালি সম্ভাবনাকে সারা দেশের ফসলের মাঠে ছড়িয়ে দেওয়ার।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।