সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

শব্দ দূষণ: এক নীরব ঘাতকের নাম

সাইফুল আযম | প্রকাশিতঃ ১ মে ২০২৬ | ২:২৫ অপরাহ্ন


শব্দ — মাত্র দুই অক্ষরের একটি ছোট্ট শব্দ, অথচ আমাদের জীবনের সঙ্গে কী গভীরভাবেই না জড়িয়ে আছে! শব্দ আসলে এক ধরনের শক্তি, যা কোনো বস্তুর কম্পনের মাধ্যমে সৃষ্টি হয় এবং বাতাসের মধ্য দিয়ে তরঙ্গাকারে আমাদের কানে এসে পৌঁছায়। ছোটবেলায় বিদ্যালয়ের বেঞ্চে কিংবা টেবিলে লাঠি দিয়ে আঘাত করলে হাতে যে মৃদু কম্পন অনুভব হতো — সেটিই ছিল শব্দ সৃষ্টির সবচেয়ে সরল পাঠ।

শব্দ যখন আশীর্বাদ

শব্দ আমাদের যোগাযোগের প্রাণ। মোবাইল ফোনে প্রিয়জনের কণ্ঠ, শিক্ষকের পাঠদান, সঙ্গীতশিল্পীর সুমধুর গান, সংবাদ পাঠকের পরিশীলিত উচ্চারণ, কিংবা একজন মোটিভেশনাল বক্তার অনুপ্রেরণাদায়ী বাণী — সবকিছুই শব্দের মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছায়। দূর থেকে গাড়ির হর্ন শুনে আমরা সতর্ক হই, কলিং বেলের শব্দে বুঝে যাই দরজায় কেউ এসেছে। প্রকৃতির পাখির ডাকে ঘুম ভাঙে, ঝিঁঝি পোকার ডাকে রাত নামে। শব্দই জীবনের সুর।

কবির ভাষায় বলতে হয় — *”পাখির ডাকে ঘুমিয়ে পড়ি, পাখির ডাকেই জাগি।”*

শব্দ যখন অভিশাপ

কিন্তু যে শব্দ জীবনের সঙ্গী, সেই শব্দই মাত্রা ছাড়ালে হয়ে ওঠে নীরব ঘাতক। আজকাল লক্ষ্য করা যায় — আস্ত একটি ট্রাকের উপর বিশাল সাউন্ড সিস্টেম বসিয়ে তরুণরা রাস্তায় উন্মত্ত নৃত্যে মেতে ওঠে। বিয়ের অনুষ্ঠান হোক বা রাজনৈতিক মিছিল, উচ্চস্বরে মাইক বাজানোর কারণে অনেকের কানে যন্ত্রণা শুরু হয়, এমনকি স্থায়ী শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার ঘটনাও বিরল নয়।

স্কুল-কলেজ ও হাসপাতালের সামনে হর্ন বাজানো নিষেধ — এই সাধারণ নিয়মটুকুও আমরা অনেকেই মানি না। যানজটে আটকা পড়লে অহেতুক হর্নের পর হর্ন — যেন শব্দের ঝড় বইয়ে দিয়েই গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে! অথচ গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত শব্দে শ্রবণশক্তি কমে যায়, রক্তচাপ বেড়ে যায়, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, এমনকি স্ট্রোক বা হৃদরোগের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই শব্দ দূষণকে চিকিৎসকেরা বলেন — “নীরব ঘাতক”।

নিরীহ প্রাণীদের আর্তনাদ

শব্দ দূষণের সবচেয়ে নির্মম শিকার হয় বোবা প্রাণীরা — যাদের কষ্টের কথা বলার ভাষা নেই। কয়েক বছর আগে থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপন উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এত পরিমাণ আতশবাজি ও পটকা ফোটানো হয়েছিল যে, ভয়ে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করতে গিয়ে অসংখ্য পাখি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আমরা যখন রঙিন আতশবাজির আলোয় উল্লাসে মাতোয়ারা, তখন আকাশে ঝরে পড়ছিল প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য — নিষ্পাপ পাখির দল।

প্রশ্ন থেকে যায় — ওই অবলা প্রাণীগুলোর দোষ কী ছিল? এই মৃত্যুর দায় নেবে কে? আমরা চাইলেও তো একটিও প্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারব না।

আমাদের করণীয়

উৎসব আমরা অবশ্যই পালন করব — কারণ আনন্দ মানুষের অধিকার। কিন্তু সেই আনন্দ যেন অন্য কারও কান্নার কারণ না হয়, অন্য কোনো প্রাণের মূল্যে না কেনা হয়। একটু সংযম, একটু সচেতনতা — এটুকুই তো প্রয়োজন।

মনে রাখতে হবে, এই পৃথিবী শুধু আমার একার নয়, আপনার একার নয়। এই পৃথিবী মানুষ, পশু, পাখি, কীটপতঙ্গ — সকল প্রাণের সম্মিলিত আবাসস্থল। প্রত্যেকেরই এখানে শান্তিতে বেঁচে থাকার অধিকার আছে।

তাই আসুন, আমরা সবাই একতাবদ্ধ হই — শব্দ দূষণ রোধে এগিয়ে আসি। অপ্রয়োজনীয় হর্ন বাজানো বন্ধ করি, উৎসবে মাত্রাজ্ঞান বজায় রাখি, রাতের নিস্তব্ধতাকে শ্রদ্ধা করি। কারণ নীরবতাও এক ধরনের সঙ্গীত — যা প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে, আমাদেরও বাঁচিয়ে রাখে।

শব্দ দূষণ রোধ করুন — নিজে বাঁচুন, প্রকৃতিকে বাঁচান।

লেখক: সহকারী শিক্ষক, কাইচতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বান্দরবান সদর।