
ঢাকা শিশু হাসপাতালের ঠান্ডা মেঝেতে বসে কোনিকা আক্তার আকাশের দিকে তাকিয়ে কাঁদছিলেন। পাশে দাঁড়িয়ে স্বামী মোহাম্মদ জাকির — মুখে শূন্যতা, বুকে চাপড়। ছয় মাস বয়সী মেয়ে রুহি তখন হামের ওয়ার্ডে শুয়ে ছিল। ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে, ওই একই বিছানায় শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছিল তার যমজ বোন রিসা।
জাকির বুক চাপড়ে বললেন একটি কথা — যে কথাটি একটি গোটা জাতিকে প্রশ্নের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়:
“যে আমার মেয়ের মতোই দেখতে — তাকে কীভাবে কবর দেব?”
দুই বোনের মুখ ছিল আয়নার মতো। একজন গেছে। আরেকজন তখনও যাচ্ছিল। আর তাদের মা — মেঝেতে পড়ে কাঁদছিলেন, যেন কান্নার শব্দে বদলে দেওয়া যাবে নিয়তি।
বদলায়নি।
এক “ভুল সিদ্ধান্ত” থেকে একটি মহামারির জন্ম
এই দৃশ্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের নয়। এটি যুদ্ধক্ষেত্রের নয়। এটি অজানা কোনো রোগের নয়।
এটি হামের মহামারি — সেই রোগ, যাকে এক দশক আগে বিজ্ঞানীরা পৃথিবী থেকে নির্মূল করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই রোগ, যার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কাছে ছিল প্রমাণিত, সস্তা এবং সহজলভ্য টিকা। সেই রোগ, যা ঠেকাতে বাংলাদেশ দশকের পর দশক ধরে গর্ব করত তার উঁচু টিকাদান হার নিয়ে।
মার্চ ২০২৬-এর মাঝামাঝি থেকে এ পর্যন্ত — মাত্র দেড় মাসে — দেশজুড়ে হামে আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৩২,০০০ ছাড়িয়ে গেছে। মৃত্যু ২৫০-এর বেশি। হাসপাতালে জায়গা নেই; কোনো কোনো শিশু চিকিৎসা পাচ্ছে মেঝেতে শুয়ে। সংক্রমণ পৌঁছে গেছে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে।
কিন্তু এই সংখ্যাগুলোর পেছনে একটি প্রশ্ন আজ বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘুরছে — এটা কি ঠেকানো যেত?
উত্তর: হ্যাঁ, যেত।
“খোদার দোহাই, এটা করবেন না” — যে অনুরোধ শোনা হয়নি
২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর দেশের দায়িত্ব নেয় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের শিশুদের হাম-রুবেলা টিকা সরবরাহ করে আসছিল ইউনিসেফ — অর্থায়নে গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স এবং বাংলাদেশ সরকার। এই ব্যবস্থাটি কাজ করত। নিখুঁতভাবে নয়, কিন্তু কার্যকরভাবে। হাজার হাজার শিশু বেঁচে যেত প্রতি বছর — সেটা কেউ গুনত না, কারণ মৃত্যু না হলে কেউ গণনায় আসে না।
সেপ্টেম্বর ২০২৫। ইউনূস সরকার সিদ্ধান্ত নেয় — ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা আর হবে না। এখন থেকে চলবে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি — সরকার দরপত্র আহ্বান করবে, সরবরাহকারীরা দর দেবে, যাচাই-বাছাই হবে, তারপর অর্ডার দেওয়া হবে।
কাগজে-কলমে, এই সিদ্ধান্তটি দেখতে স্বচ্ছ। যুক্তিযুক্ত। “নিয়মতান্ত্রিক”।
ইউনিসেফ এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছিল।
বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বারবার সতর্ক করেছিলেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের। অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমকে তিনি বলেছিলেন একটি কথা — যা আজ ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে অপ্রিয় সত্যের মতো করে:
“খোদার দোহাই… এটা করবেন না।”
এটি কোনো কূটনৈতিক ভাষা নয়। এটি একটি মানুষের আর্তনাদ — যিনি আগে থেকেই দেখতে পাচ্ছিলেন কী আসছে।
তিনি জানতেন, টিকার সরবরাহ একদিন বন্ধ হলে পরিণতি আসে এক বছর পরে — যখন রোগটি ছড়াতে শুরু করে। তিনি জানতেন, প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র দ্রুত নড়ে না, কিন্তু ভাইরাস নড়ে। তিনি জানতেন, সিদ্ধান্ত নেয় বড়রা, কিন্তু মূল্য চোকায় ছোটরা।
তবুও সিদ্ধান্ত পাল্টানো হয়নি।

সতর্কবার্তা যেভাবে সত্যি হলো
ইউনিসেফের আশঙ্কা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল।
দরপত্র প্রক্রিয়া আটকে গেল আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়। টিকার সরবরাহ শুকিয়ে গেল। দেশজুড়ে দেখা দিল নজিরবিহীন স্টকআউট — অর্থাৎ, যে শিশুটিকে ৯ মাস বয়সে টিকা দেওয়ার কথা ছিল, সে পেল না। যে শিশুটিকে ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ পাওয়ার কথা ছিল, সে-ও পেল না।
২০২৪ সালের জন্য পরিকল্পিত একটি জাতীয় সম্পূরক হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি — যেটি রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৫-এ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল — সেটি পুরোপুরি বাতিল হয়ে গেল।
এ বছরের মার্চের শেষে সরকারি তথ্য বলেছিল, ২০২৫ সালে যোগ্য শিশুদের মাত্র ৫৯ শতাংশ হামের টিকা পেয়েছে। হাম ঠেকাতে দরকার ৯৫ শতাংশ কভারেজ।
৫৯ আর ৯৫ — এই দুটি সংখ্যার মাঝখানে রয়েছে কয়েক লক্ষ শিশুর অরক্ষিত শরীর। আর ভাইরাস ঠিক সেই ফাঁকেই ঢুকে পড়ে।
(তথ্যটি পরে সরকারের ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।)
যেখানে শুরু, যেদিকে যাচ্ছে
এই মহামারির শুরু এ বছরের জানুয়ারিতে — মিয়ানমার সীমান্তের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে। সেখান থেকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দেশে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২১,০০০-এরও বেশি শিশু।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২৩ এপ্রিলের এক হালনাগাদে বলেছে, এই সংক্রমণ মিয়ানমার ও ভারতে ছড়িয়ে পড়ার “উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি” রয়েছে। সংস্থাটি এই প্রাদুর্ভাবকে অভিহিত করেছে — “হাম নির্মূলে বাংলাদেশের আগের অগ্রগতির এক বিপরীত যাত্রা” হিসেবে।
ভেতরের চিত্র আরও করুণ। বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ২৮ শতাংশ শিশু খর্বকায়, ১০ শতাংশ কৃশকায়। ভিটামিন এ-র ঘাটতি শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করে দেয় — আর ২০২৪ থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ তার ছয় মাস অন্তর অন্তর হওয়া ভিটামিন এ ক্যাম্পেইনের তিনটিই বাদ দিয়েছে।
অর্থাৎ, যে শিশুরা এমনিতেই দুর্বল, তারাই ভাইরাসের মুখোমুখি হয়েছে — কোনো ঢাল ছাড়া।
আইইডিসিআর-এর উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসাইন বলেছেন, “টিকার ঘাটতি ছাড়াও বাংলাদেশের হাম সংকট প্রকাশ করছে এক গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা।”
তিনি আরও বলেছেন একটি কথা — যা প্রশ্নের মতো শোনায়, কিন্তু আসলে অভিযোগ:
“এটা তো ইতিমধ্যেই একটি জরুরি অবস্থা। তাহলে আনুষ্ঠানিকভাবে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে এত দ্বিধা কেন?”
দায় কার?
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ দায়িত্ব নেওয়া নতুন নির্বাচিত সরকার এপ্রিলে আবার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহের পদ্ধতি ফিরিয়ে এনেছে। ৫ এপ্রিল উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য জরুরি টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে; ২০ এপ্রিল থেকে চালু হয়েছে দেশব্যাপী কর্মসূচি।
কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক রোগ নিয়ন্ত্রণ পরিচালক বে-নজির আহমেদ বলেছেন, “টিকাদানের এই গতিতে সংক্রমণ এখন কমবে না।”
ভাইরাস অপেক্ষা করে না।
ইতিমধ্যে আইনি জবাবদিহির পথ খুলে গেছে। ১২ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাস দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ করেছেন — অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে টিকা সংগ্রহে দুর্নীতি ও ব্যর্থতার অভিযোগে। এমনকি ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্সও বলেছেন, এই বিশাল পরিণতির আলোকে সিদ্ধান্তটি তদন্তের প্রয়োজন আছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য সাইদুর রহমান Science-কে এক ইমেইলে লিখেছেন, পুরনো সংগ্রহ পদ্ধতি একটি জরুরি ধারার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে ছিল, তাই সেটিকে “নিয়মতান্ত্রিক” করার দরকার ছিল — যাতে “স্বচ্ছতার প্রশ্ন বা পক্ষপাতের ধারণা” এড়ানো যায়।
ঠিক কী ভুল হয়েছিল, সেই প্রশ্নের ফলো-আপ উত্তর তিনি দেননি। তবে শেষে লিখেছেন:
“হামের মতো সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে শিশুদের হারানো হৃদয়বিদারক। এটি একটি মানবিক ট্র্যাজেডি, এবং প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা।”
সমবেদনা ভালো জিনিস। কিন্তু সমবেদনা টিকা নয়।
যা থেকে যায়
পাবলিক হেলথ — অর্থাৎ জনস্বাস্থ্য — এমন এক বিষয়, যার সাফল্য কখনো শিরোনামে আসে না। যে শিশুটি হামে মরেনি কারণ সে টিকা পেয়েছিল — সেই শিশুটির খবর কোনো কাগজে ছাপা হয় না। সে স্কুলে যায়, খেলে, বড় হয়, একদিন বাবা-মা হয়। জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় বিজয় হলো — কিছুই না ঘটা।
কিন্তু ব্যর্থতার ছবি দ্রুত আসে। আসে কোনিকা আক্তারের মুখ দিয়ে, যিনি একদিনে এক মেয়ে হারিয়ে আরেক মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। আসে ৪২ দিন বয়সী এক শিশুর নাকে অক্সিজেন নলের ছবি দিয়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন — এই ট্র্যাজেডি আসলে দেখিয়ে দিচ্ছে, জনস্বাস্থ্যে অর্জিত অগ্রগতি কত দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে। কয়েক দশকের পরিশ্রমের ফলাফল মুছে যেতে পারে একটি টেবিলে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত দিয়ে।
ইউনিসেফের একজন প্রতিনিধি একদিন বসেছিলেন এক স্বাস্থ্য উপদেষ্টার সামনে। বলেছিলেন, “খোদার দোহাই, এটা করবেন না।”
তাঁর কথাটি লেখা হয়নি কোনো ফাইলে। কোনো গেজেটে আসেনি। সংসদে পঠিত হয়নি।
কিন্তু সেই বাক্যটি আজ লেখা আছে — ঢাকা শিশু হাসপাতালের এক বিছানার পাশে, যেখানে এক যমজ বোন তার আরেক যমজ বোনের শেষ শয্যায় শুয়ে আছে।
ইতিহাস কখনো কখনো আনুষ্ঠানিক নথিতে নয়, একটি শিশুর মুখে লেখা হয়।
— তথ্যসূত্র: Anik Rahman, “Measles explodes in Bangladesh after vaccination breakdown, killing hundreds of children,” Science (ScienceInsider), 30 April 2026.