আনোয়ারার হাড়িয়া পাড়ায় ১৪ বছরের এক কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় প্রধান আসামি আবু তাহের এখনও পলাতক। কিন্তু এবার মুখ খুললেন তার ভাই— শহীদ জিয়া স্মৃতি সংসদ, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সদস্য সচিব গাজী মো. নাছির উদ্দীন।
একুশে পত্রিকার সঙ্গে এক টেলিফোন আলাপে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বললেন— ভাই যদি সত্যিই অপরাধ করে থাকেন, তাহলে দেশের আইন অনুযায়ী তার কঠোর বিচার হোক।
তবে এই বক্তব্যের বিপরীতে এখন উঠে আসছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
যা বললেন নাছির উদ্দীন
এ প্রতিবেদক যখন তাকে জিজ্ঞেস করলেন, মামলা না নেওয়ার জন্য থানায় চাপ দিয়েছেন কিনা— নাছির উদ্দীন সরাসরি অস্বীকার করলেন। বললেন, “থানায় আমার কোনো যোগাযোগও হয়নি। তাদের সাথে আমার দেখাও হয়নি।”
এরপর তিনি যা বললেন, সেটি অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত— “সে যদি অন্যায় করে থাকে, এর কঠোরভাবে বিচার হোক। আমি বিচার চাই। দেশের আইন অনুযায়ী এর বিচার হোক।”
নাছিরের দাবি ও প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান: সরাসরি সংঘাত
কিন্তু নাছির উদ্দীনের এই দাবিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে একটি প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান। আনোয়ারার ওই এলাকার বাসিন্দা, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি— যিনি আবু তাহেরদের একই বাড়ির বাসিন্দা— শনিবার রাতে একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন, মামলা দায়েরের আগের দিন তিনি নিজে আনোয়ারা থানায় গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন, গাজী নাছির উদ্দীন থানায় এসেছেন।
তিনি বলেন, “আমি গেছিলাম গতকাল। গতকাল আমি থানায় গেছি, ও যখন আসছে নাছির, তখন আমিও ছিলাম, বাইরে ছিলাম, আড়ালে ছিলাম আমাদেরকে না দেখার জন্য।”
শুধু তাই নয়, তিনি আরও জানান, নাছিরের সঙ্গে সেদিন থানায় গিয়েছিলেন রায়পুর ইউনিয়নের পরিচিত মুখ, স্থানীয়ভাবে ‘বাবু’ নামে পরিচিত এক বিএনপি নেতার ভাই ‘শিফু’। তিনি বলেন, “নাসিরের সাথে শিফুও গেছে। বিএনপির শিফু।”
এই বয়ান যদি সত্য হয়, তাহলে নাছির উদ্দীনের “থানায় যোগাযোগ হয়নি” দাবিটি সরাসরি মিথ্যা প্রমাণিত হয়। আর তখন প্রশ্ন ওঠে— তিনি থানায় গিয়েছিলেন কেন? ভাইয়ের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের দাবি জানাতে, নাকি মামলার গতিপথ প্রভাবিত করতে?
তদবিরের অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্য
ভুক্তভোগীর পরিবারের দাবি ছিল, মামলা করতে গিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল থেকে বাধা দেওয়া হয়েছে। ঘটনার চার দিন পর মামলা নেওয়া হয়েছে। এই দেরির পেছনে আবু তাহেরের রাজনৈতিক পরিচয়সম্পন্ন ভাইয়ের প্রভাব কাজ করেছে কিনা— এ প্রশ্ন এলাকায় জোরালোভাবে ঘুরছিল।
নাছির উদ্দীন সেই অভিযোগ সরাসরি নাকচ করলেন। তার ভাষ্যমতে, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানতেন না এবং থানা বা ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ হয়নি।
কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান বলছে ভিন্ন কথা। দুটি বক্তব্যের মধ্যে যে বিস্তর ফারাক, তা এই মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে সামনে আসছে।
বিচার চাওয়া যথেষ্ট নয়, বলছেন বিশ্লেষকরা
লক্ষণীয় বিষয় হলো, ঘটনার শুরু থেকে নাছির উদ্দীন নীরব থাকলেও রায়পুর ইউনিয়নজুড়ে তার বিরুদ্ধে তীব্র গণক্ষোভ দানা বেঁধে ওঠার পর তিনি হঠাৎ সরব হয়েছেন এবং বিচারের দাবি জানাতে শুরু করেছেন। এলাকাবাসীর একটি বড় অংশ মনে করছেন, এটি আসলে ভোল পাল্টানো— জনরোষের মুখে নিজেকে বাঁচাতে কৌশলী অবস্থান নেওয়া। কারণ, যখন মামলা নেওয়া হচ্ছিল না, যখন একটি পরিবার বিচারের দরজায় ধাক্কা খাচ্ছিল— তখন তার কণ্ঠ ছিল নীরব।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, গাজী নাছির উদ্দীনের বিচার চাওয়ার বক্তব্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে প্রত্যাশা কেবল কথায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না। পলাতক আসামিকে আইনের হাতে তুলে দিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখলেই কেবল এই বক্তব্যের সত্যিকারের মূল্য প্রমাণিত হবে।
এর মধ্যে থানায় তার উপস্থিতির তথ্য যদি সত্য বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে প্রশ্ন আরও গভীর হয়— তিনি কি সত্যিই বিচার চান, নাকি বিচারের পথে নিজেই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন?
একটি কিশোরীর জীবন ধ্বংস হয়েছে। চার দিন বিচারের দরজায় ধাক্কা খেয়েছে তার পরিবার। আসামি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই প্রেক্ষাপটে “বিচার চাই” বলাটা যথেষ্ট কিনা— সেই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে কাজ দিয়ে, কথা দিয়ে নয়।
পুলিশ কী বলছে
আনোয়ারা থানার ওসি মো. জুনায়েত চৌধুরী জানিয়েছেন, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি পুনরায় নিশ্চিত করেছেন।
তবে থানায় প্রভাবশালীদের আনাগোনার যে তথ্য সামনে এসেছে, তা নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কিন্তু মামলার আসামিরা এখনও পলাতক— এই তথ্যটিই বলে দিচ্ছে, ন্যায়বিচারের পথ এখনও দীর্ঘ।
গাজী নাছির উদ্দীন বলেছেন, “আমার কোনো ইয়া নাই।” কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী বলছেন ভিন্ন কথা। দুটি বয়ানের মধ্যে একটি সত্য, একটি মিথ্যা— সেটি বের করার দায়িত্ব এখন তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের।
একটি ১৪ বছরের মেয়ে অপেক্ষায় আছে। পুরো আনোয়ারা অপেক্ষায় আছে। এবং অপেক্ষায় আছে এই প্রশ্নের উত্তর— থানার ভেতরে সেদিন আসলে কী হয়েছিল।