
সকাল থেকেই চট্টগ্রামের আকাশ মেঘলা। থেমে থেমে বৃষ্টি। কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতা। এই প্রতিকূল আবহাওয়াতেও পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছেন অভিভাবকরা। ভেতরে সন্তান পরীক্ষা দিচ্ছে, বাইরে মা-বাবার অপেক্ষার প্রহর গোনা। তিন ঘণ্টার এই অপেক্ষা কখনো রোদে পোড়ায়, কখনো বৃষ্টিতে ভেজায়।
কিন্তু আজ রোববার (৩ মে) চট্টগ্রামের কয়েকটি পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে দৃশ্যটা ছিল একটু আলাদা। ভিড়ের মধ্যে হেঁটে আসছেন একজন মানুষ— হাতে পানির বোতল, পাশে নাস্তার প্যাকেট। তিনি কোনো স্বেচ্ছাসেবী নন, কোনো এনজিও কর্মীও নন। তিনি চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান।
যেভাবে শুরু এই মানবিক যাত্রা
এটি কোনো হঠাৎ আবেগের উদ্যোগ নয়। গত বছর থেকেই এসএসসি পরীক্ষার সময় অভিভাবকদের পাশে দাঁড়ানোর এই কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছেন সাঈদ আল নোমান। এবারও গত ২১ এপ্রিল পরীক্ষা শুরুর প্রথম দিন থেকেই চালু হয় এই আয়োজন।
বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সম্প্রতি তিনি বিএনপির প্রতিনিধি দলের সঙ্গে চীন সফরে ছিলেন। কিন্তু বিদেশে থেকেও এই কর্মসূচি বন্ধ রাখেননি। তার নির্দেশে প্রতিনিধি দল প্রতিদিন কেন্দ্রে কেন্দ্রে গিয়ে অভিভাবকদের হাতে পানি ও নাস্তা তুলে দিয়েছে। দেশে ফিরেই আজ তিনি নিজে ছুটে গেছেন পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে।
একের পর এক কেন্দ্র, একই আন্তরিকতা
আজ সকালে সাঈদ আল নোমান পরিদর্শন করেন অঙ্কুর সোসাইটি উচ্চ বিদ্যালয়, নাসিরাবাদ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, নাসিরাবাদ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সিএমপি স্কুল এবং গরীবে নেওয়াজ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র। প্রতিটি কেন্দ্রে তিনি অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেন, সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ নেন এবং তাদের বসার জন্য ছায়াযুক্ত স্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন।
শুধু পানি ও নাস্তাই নয়, নগরীর বড় দশটি পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে পর্যাপ্ত চেয়ার, টেবিল ও ত্রিপলসহ প্যান্ডেল স্থাপন করা হয়েছে— যাতে অভিভাবকরা আরামে বসে সন্তানের অপেক্ষা করতে পারেন।
অভিভাবকদের কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা
অঙ্কুর স্কুলে আসা অভিভাবক আমেন বেগম বললেন, “আমি কোনোদিন দেখিনি একজন এমপিকে কেন্দ্রে এসে অভিভাবকদের খোঁজখবর নিতে। চট্টগ্রামে এই মুহূর্তে অনেক স্থানে পানি উঠেছে, সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। অথচ তিনি আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন ভিন্নভাবে।”
সিএমপি স্কুলের অভিভাবক মো. রোকনুজ্জামান জানান, ভেতরে সন্তান পরীক্ষা দিচ্ছে, তিন ঘণ্টা বাইরে অপেক্ষা করতে হয়। রোদ-বৃষ্টিতে এই অপেক্ষা অনেক কষ্টের। কিন্তু সাঈদ আল নোমানের এই উদ্যোগ সেই অপেক্ষায় এনে দিয়েছে স্বস্তি।
গরীবে নেওয়াজ স্কুলের বাইরে অপেক্ষায় থাকা রোকসানা বেগম বললেন, “অনেক কেন্দ্রের সামনে কোনো দোকান নেই। এমপি সাহেব বিদেশে থাকলেও প্রথম দিন থেকে আমাদের জন্য নাস্তা ও পানির ব্যবস্থা করেছেন। এটা আমাদের জন্য অনেক সুবিধার।”
যা বললেন সাঈদ আল নোমান
নিজের এই উদ্যোগ প্রসঙ্গে সাঈদ আল নোমান বলেন, “একজন জনপ্রতিনিধির মূল সার্থকতা নিহিত থাকে সাধারণ মানুষের সুখে-দুখে তাদের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে। তীব্র রোদে পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষমাণ অভিভাবকদের একটু পানি বা ছায়ার ব্যবস্থা করা আমার দায়িত্বের বাইরে কিছু নয়, বরং এটি আমার নাগরিক ও মানবিক কর্তব্য।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের সবার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সেবামূলক প্রচেষ্টাই একদিন একটি সুন্দর ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।”
রাজনীতিতে নতুন দৃষ্টান্ত
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যাচ্ছে, একজন সংসদ সদস্য কেন্দ্রে কেন্দ্রে ঘুরে সাধারণ অভিভাবকদের হাতে পানির বোতল তুলে দিচ্ছেন, কুশল জিজ্ঞেস করছেন, পরীক্ষার্থীদের জন্য শুভকামনা জানাচ্ছেন। এই দৃশ্য দেখে অনেকেই বলছেন— বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি সত্যিকার অর্থেই একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ।
সচেতন মহল বলছেন, ক্ষমতার প্রদর্শনী নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই সংস্কৃতিই রাজনীতিকে তার প্রকৃত মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে পারে। সাঈদ আল নোমানের এই উদ্যোগ কেবল চট্টগ্রামের জন্য নয়, সারাদেশের জনপ্রতিনিধিদের জন্য হতে পারে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।