
মহাবিশ্বের অসীম বিশালতার কাছে আমাদের এই পরিচিত পৃথিবী নামক গ্রহটি নিতান্তই একটি ক্ষুদ্র ধূলিকণার মতো ভাসমান। এই অনন্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, এর উৎপত্তি এবং এর পেছনের সুনিপুণ কারিগরি সম্পর্কে মানুষের অর্জিত জ্ঞান এখনো অনেকটাই সীমিত পর্যায়ের। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে নিজেদের দাবি করলেও, প্রকৃতি এবং সৃষ্টিকর্তার এই বিশাল আয়োজন ও নিখুঁত শৃঙ্খলার কাছে আমরা প্রতিনিয়তই বিস্ময়ে হতবাক হই। বিজ্ঞানকে কোনোভাবেই প্রকৃতির প্রতিপক্ষ বা সৃষ্টিকর্তার বিপরীত কোনো ধারণা হিসেবে দাঁড় করানো যৌক্তিক নয়। বরং, বিজ্ঞান মূলত এই প্রকৃতিরই লুকায়িত নিয়ম-কানুন এবং মহাজাগতিক রহস্য উন্মোচনের এক নিরন্তর ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টা মাত্র। মানুষের কৌতূহলী মন যখন প্রকৃতির এই সুশৃঙ্খল নিয়মগুলোকে গাণিতিক ও যৌক্তিকভাবে বোঝার চেষ্টা করে, তখনই বিজ্ঞানের জন্ম হয়।
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সবচেয়ে মৌলিক চাহিদা—অন্ন, বস্ত্র এবং বাসস্থানের দিকে গভীরভাবে তাকালেই আমরা প্রকৃতির অপার দান ও এর ওপর আমাদের পরম নির্ভরশীলতা উপলব্ধি করতে পারি। বিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণায় এবং তাদের দেখানো পথে আমরা কৃষিকাজ, জিনতত্ত্ব বা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে অভাবনীয় উন্নতি সাধন করেছি ঠিকই, কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে একটি চালের দানা, একটি মাছ কিংবা এক চিমটি লবণের মূল গাঠনিক উপাদান কিন্তু সরাসরি প্রকৃতি থেকেই আসে। গবেষণাগারে বিজ্ঞানীরা হয়তো বীজের উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করতে পারেন, কিন্তু সেই বীজের অঙ্কুরোদ্গমের জন্য মাটি, জল এবং সূর্যালোকের যে প্রাকৃতিক রসায়ন প্রয়োজন, তা কোনো যন্ত্র দিয়ে কৃত্রিমভাবে অবিরাম তৈরি করা সম্ভব নয়। প্রকৃতির বৃষ্টি চক্র বা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মতো জটিল জৈব-রাসায়নিক পদ্ধতিগুলো বিজ্ঞান কেবল ব্যাখ্যা করতে পেরেছে, কিন্তু এগুলোকে পাশ কাটিয়ে জীবনধারণের কোনো বিকল্প পথ তৈরি করতে পারেনি। ঠিক তেমনি, বস্ত্রশিল্পে আজ আমরা কৃত্রিম তন্তুর ব্যবহার দেখছি, কিন্তু এর আদি উৎস সেই তুলো গাছ, পশুর পশম কিংবা রেশম পোকা। তুলো গাছ থেকে সুতো এবং সুতো থেকে কাপড় তৈরির যে প্রাচীন ও আধুনিক প্রক্রিয়া, তার প্রতিটি স্তরের পেছনেই রয়েছে প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম।
বাসস্থান ও আধুনিক সভ্যতার অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে তাকালে এই নির্ভরশীলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত কাঁচামাল যেমন লোহা, বালু, চুনাপাথর বা গ্রানাইট ব্যবহার করেই প্রকৌশলীরা গড়ে তুলছেন গগনচুম্বী সব অট্টালিকা কিংবা মহাসমুদ্র দাপিয়ে বেড়ানো বিশাল রণতরী ও মালবাহী জাহাজ। সিলিকা বা বালুকে প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি হচ্ছে কাঁচ, যা আধুনিক ইমারতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। খনিজ সম্পদ থেকে বহু পরিশ্রমে আহরিত সোনা, রুপা বা হীরার মতো মূল্যবান বস্তুই আমাদের অলংকার ও সৌন্দর্যবর্ধনে ব্যবহৃত হচ্ছে। অত্যন্ত অবাক করা বিষয় হলো, এই খনিজ পদার্থগুলোও পৃথিবীর বুকে এমনি এমনি আসেনি। বিজ্ঞানীরাই আমাদের জানিয়েছেন যে, সোনা বা লোহার মতো ভারী মৌলগুলো তৈরি হয়েছে কোটি কোটি বছর আগে কোনো এক মৃত নক্ষত্রের প্রলয়ংকরী বিস্ফোরণ বা সুপারনোভা থেকে, যা পরবর্তীতে পৃথিবীর বুকে সঞ্চিত হয়েছে। অর্থাৎ, বিজ্ঞানীরা শূন্য থেকে কোনো মৌলিক পদার্থ সৃষ্টি করেন না বা করতে পারেন না; বরং তারা প্রকৃতির দেওয়া এই অসীম সম্পদকে মানুষের ব্যবহারোপযোগী করে তোলেন মাত্র।
পৃথিবীর উপরিভাগের একটি বিশাল অংশ, প্রায় ৭১ শতাংশ জুড়ে রয়েছে মহাসাগর। এত প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের পরও এই মহাসাগরের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি এলাকা এখনো মানুষের কাছে পুরোপুরি অজানা বা বিস্তারিত মানচিত্রের আওতার বাইরে রয়ে গেছে। সমুদ্রের গভীরতম খাত মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলদেশে যেখানে সূর্যালোক পৌঁছায় না এবং জলের চাপ অকল্পনীয়, সেখানেও প্রকৃতির এক অদ্ভুত খেয়ালে বেঁচে আছে বিচিত্র সব জলজ প্রাণী। এসব প্রাণী কীভাবে চরম চাপ ও অন্ধকারে টিকে আছে, তা বিজ্ঞানীদের কাছে এক বিশাল বিস্ময়। অন্যদিকে ডাঙ্গায় পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত অ্যামাজনের মতো গভীর ও দুর্গম জঙ্গলে এখনো এমন হাজারো প্রজাতির উদ্ভিদ, কীটপতঙ্গ ও প্রাণীর বাস, যা হয়তো বিজ্ঞানের নথিতে এখনো যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। প্রতিটি নতুন আবিষ্কার আমাদের জানান দেয় যে, প্রকৃতির বৈচিত্র্য অনুধাবন করার পথে আমরা এখনো কেবল হাঁটতে শুরু করেছি।
পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে মহাকাশের বিশালতার কথা চিন্তা করলে আমাদের সীমাবদ্ধতা এবং মহাবিশ্বের ব্যাপ্তি আরও প্রকটভাবে ধরা দেয়। আমরা মহাবিশ্বের অজানা রহস্য আবিষ্কারের জন্য জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মতো অত্যাধুনিক যন্ত্র বা ভয়েজার সিরিজের মতো মহাকাশযান পাঠাচ্ছি ঠিকই। এসব যন্ত্র আমাদের প্রতিনিয়তই লাখ লাখ আলোকবর্ষ দূরের নতুন নতুন গ্যালাক্সি বা নীহারিকার ছবি পাঠাচ্ছে। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হলো, আমাদের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী গ্রহ মঙ্গলেও এখন পর্যন্ত কোনো মানুষ সশরীরে পা রাখতে পারেনি; কেবল কিছু যন্ত্রচালিত রোভার সেখানে বিচরণ করছে। আমাদের নিজেদের গ্যালাক্সি মিল্কওয়েতেই রয়েছে দশ থেকে চল্লিশ হাজার কোটি নক্ষত্র। আর মহাশূন্যে এমন গ্যালাক্সির সংখ্যাও শত কোটির ওপরে। সেখানে থাকা অসংখ্য ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বরগুলো মহাকর্ষের এমন এক চরম অবস্থা তৈরি করে যেখানে পদার্থবিজ্ঞানের চেনা সূত্রগুলোও আর কাজ করে না। এই অসীম ব্যাপ্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মহাবিশ্বের বিশালতা হয়তো পৃথিবীর বুকে থাকা সমস্ত সমুদ্রসৈকত ও মরুভূমির বালুকণার চেয়েও অনেক গুণ বেশি।
সবশেষে, জীবন এবং মৃত্যুর মতো ধ্রুব ও চিরন্তন সত্যের সামনে বিজ্ঞান সর্বদা মাথা নত করে। একটি প্রাণহীন রাসায়নিক অণুর মিশ্রণ কীভাবে হঠাৎ করে প্রাণবন্ত কোষে পরিণত হয় এবং তার মধ্যে চেতনার সঞ্চার ঘটে, তা আজও জীববিজ্ঞানের অন্যতম বড় রহস্য। চিকিৎসাবিজ্ঞান আজ অভাবনীয় উন্নতি করেছে; জটিল অঙ্গ প্রতিস্থাপন থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে নিভৃত রোগ নির্ণয়—সবই আজ সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু প্রতিটি প্রাণীকে তার মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে, এটি প্রকৃতির এক অমোঘ এবং অপরিবর্তনীয় নিয়ম। কার কখন মৃত্যু হবে বা শরীরের ঠিক কোন কোষটির পতনের মাধ্যমে একটি সচল প্রাণের অবসান ঘটবে, তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা মানুষের সাধ্যের অতীত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এত ব্যাপক উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও একজন মৃত মানুষের দেহে চেতনা বা প্রাণবায়ু পুনরায় ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা কোনো চিকিৎসক বা বিজ্ঞানীর নেই।
তাই পরিশেষে বলা যায়, সৃষ্টিকর্তার এই বিশাল সৃষ্টির রহস্য পুরোপুরি ভেদ করা বিজ্ঞানের পক্ষে হয়তো কখনোই সম্ভব নয়। বিজ্ঞান অসহায় নয়, বরং বিজ্ঞান হলো সেই চিরন্তন ও বিনয়ী শিক্ষার্থী, যে এই অসীম রহস্যের পাঠশালায় বসে প্রকৃতির নিয়মগুলো ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর অংশে বোঝার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সৃষ্টিকর্তার এই বিশাল ক্যানভাসে বিজ্ঞান কেবল রঙের পেছনের রসায়নটুকু একটু একটু করে ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু সেই চিত্রকর্মের সামগ্রিক বিশালতা ও সৌন্দর্য সর্বদাই মানুষের কল্পনা এবং অহংকারকে হার মানায়।
লেখক: সহকারী শিক্ষক, কাইচতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বান্দরবান সদর।