সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

কৃষকের বুকেও কালবৈশাখী

তিন দিনের ঝড়ে দীঘিনালায় দুই কোটি টাকার ফসল ধ্বংস— আম গাছ উপড়ে, কলা বাগান শেষ, ধান তলিয়ে পানিতে
জাকির হোসেন | প্রকাশিতঃ ৪ মে ২০২৬ | ৬:০০ অপরাহ্ন


একটি ছবি মনে গেঁথে যায়। বুকসমান ঘোলা পানিতে দাঁড়িয়ে কয়েকজন কৃষক। হাতে ধানের আঁটি। চারদিকে থৈথৈ পানি— তার নিচে তলিয়ে আছে তাদের স্বপ্নের ফসল। তারা জানেন, এই ধানের বেশিরভাগই আর ঘরে উঠবে না। তবু তুলছেন। কারণ হাল ছেড়ে দেওয়ার বিলাসিতা প্রান্তিক কৃষকের থাকে না।

এটি দীঘিনালার মাঠের চিত্র। গত ২৬ এপ্রিল সন্ধ্যা থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত টানা তিন দিনের কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টিতে খাগড়াছড়ির এই উপজেলায় যা ঘটেছে, তা কেবল ফসলের ক্ষতি নয়— এটি অনেক পরিবারের সারা বছরের সংসারের হিসাব মুছে দেওয়া।

মাঠে গিয়ে যা দেখা গেল

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে যে চিত্র চোখে পড়েছে, তা দেখে বুক ভারী হয়ে আসে।

আমবাগানে ঢুকলে দেখা যায়— বড় বড় গাছ শিকড়সহ উপড়ে মাটিতে পড়ে আছে। গাছের চারপাশে ছড়িয়ে আছে অপরিপক্ব কাঁচা আম। যে আম আর কখনো পাকবে না, বাজারে যাবে না। মাথার উপরে মেঘলা আকাশ, নিচে ধ্বংসের স্তূপ।

কলাবাগানের দৃশ্য আরও করুণ। সারি সারি কলাগাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। কোনো গাছে এখনো কাঁচা কলার থোকা ঝুলছে— কিন্তু গাছ মরে গেছে, ফল আর পাকবে না। বাঁশের বেড়া ভেঙে চুরমার। যে বাগান গড়তে বছরের পর বছর লেগেছে, এক রাতের ঝড়ে তার অস্তিত্ব মুছে গেছে।

ধানক্ষেতের অবস্থা সবচেয়ে হৃদয়বিদারক। যেখানে সপ্তাহ আগেও সোনালি ধানের সমুদ্র ছিল, সেখানে এখন ঘোলা পানির বিস্তার। ধানগাছের মাথা কোথাও কোথাও পানির উপরে উঁকি দিচ্ছে— বাকিটা তলিয়ে গেছে। আর সেই পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে কৃষকরা যতটুকু পারছেন তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

সংখ্যায় বিপর্যয়

দীঘিনালা কৃষি অফিসের প্রাথমিক হিসাব বলছে, কালবৈশাখীর তাণ্ডবে উপজেলায় প্রায় ১২.৫ হেক্টর বোরো ধানের জমি, ৮ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি জমি, ১৫৭ হেক্টর আমবাগান এবং ১৬৮ হেক্টর কলাবাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

টাকার অঙ্কে শুধু আমেই ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৯৪ লাখ ২০ হাজার টাকা। কলায় ৮৫ লাখ ৬৮ হাজার। অন্যান্য ফসলে আরও প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার। এখন পর্যন্ত মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ৯২ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। বোরো ধান ও সবজির ক্ষতির হিসাব এখনো চলছে— সব মিলিয়ে মোট ক্ষতি ২ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

কৃষকের মুখে যন্ত্রণার কথা

মধ্যবোয়ালখালির ধানচাষি মো. আবু তালেব জানালেন, তার তিন কানি জমির কেটে রাখা ধান পানিতে ডুবে গেছে। মাঠে কেটে রেখেছিলেন, ভেবেছিলেন পরদিন ঘরে তুলবেন— কিন্তু রাতের ঝড়ে সব শেষ।

দীঘিনালা ইউনিয়নের কলাচাষি শান্তি প্রিয় চাকমার কণ্ঠে হতাশার সুর— “ঋণ করে ৩ একর জমিতে কলা চাষ করেছিলাম। সব গাছ ভেঙে পড়েছে, অপরিপক্ব কলা নষ্ট হয়ে গেছে। আমি এখন অসহায়।”

বোয়ালখালি ইউনিয়নের প্রিয়দর্শী চাকমার অবস্থা আরও বেদনাদায়ক। ঋণ নিয়ে ৭ একর জমিতে দেশি-বিদেশি আমের বাগান গড়েছিলেন। ঝড়ে ১০০ থেকে ১৫০টি গাছ গোড়া থেকে উপড়ে গেছে, তিন ভাগের দুই ভাগ আম মাটিতে পড়ে গেছে।

এই মানুষগুলোর মিল একটাই — সবাই ঋণ নিয়ে চাষ করেছিলেন। এখন ফসল নেই, কিন্তু ঋণ রয়ে গেছে।

কৃষি বিভাগ যা বলছে

দীঘিনালা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন বললেন, ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করলেন।

কিন্তু খোঁজখবর রাখা আর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পাশে দাঁড়ানো এক কথা নয়। যে কৃষক ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পানিতে দাঁড়িয়ে ডুবন্ত ধান তুলছেন, তার জন্য পরামর্শ যথেষ্ট নয়।

একটি প্রশ্ন

কালবৈশাখী প্রতি বছরই আসে। পাহাড়ি এই জনপদের কৃষকরা প্রতি বছরই ক্ষতির মুখে পড়েন। প্রতি বছরই ক্ষতির হিসাব হয়, কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু প্রান্তিক কৃষকের কাছে সহায়তা পৌঁছায় কিনা— সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত।

বুকসমান পানিতে দাঁড়িয়ে যে কৃষক শেষবারের মতো ডুবন্ত ধান তুলছেন— তার চোখের দিকে তাকিয়ে একটাই প্রশ্ন মনে আসে, যেটি এই প্রতিবেদকও জিজ্ঞেস করতে চান— কৃষকের এই কালবৈশাখী ঝড় কে থামাবে?