
রাত গভীর হলে চট্টগ্রামের কোরিয়ান ইপিজেডের (কেইপিজেড) ভেতর থেকে ভেসে আসে কুঠারের ঘা। একের পর এক গাছ পড়ে। অন্ধকারে নিঃশব্দে চলে যায় কাঠের বোঝা। আর ভোর হলে দেখা যায়, প্রকৃতির আরেকটুকু বুক খালি হয়ে গেছে। এই নির্মম সত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে আজ আহত নিরাপত্তারক্ষী, বিপর্যস্ত পুলিশ, আর অসহায় কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রামের বুকে এক চিলতে সবুজ স্বর্গ গড়ে তোলার নিরলস সাধনায় ব্রতী কোরিয়ান ইপিজেড— কেইপিজেড। বিদেশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান আর পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের মিলিত স্বপ্ন নিয়ে এই প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ধরে গড়ে তুলছে একটি সবুজ বলয়। কিন্তু সেই স্বপ্নে আজ কুঠারাঘাত করছে একটি সংঘবদ্ধ, নিষ্ঠুর বনখেকো চক্র।
যেভাবে শুরু— হাত ভাঙার রাত
গত বৃহস্পতিবার রাত। কেইপিজেডের নিরাপত্তারক্ষী মো. তোবারক আলী (৪৫) তাঁর নিয়মিত টহলে ছিলেন। হঠাৎ সন্দেহজনক শব্দ। এগিয়ে গিয়ে দেখলেন, একদল লোক গাছ কেটে বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। বাধা দিতে গেলেন। আর তখনই নেমে এল পাশবিক আক্রমণ। দা, কিরিচ আর রামদা হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ল চক্রের সদস্যরা। ভেঙে গেল তোবারক আলীর হাত। এই ঘটনার পর থানায় মামলা দায়ের করা হয়।
সিসিটিভিতে ধরা পড়া মধ্যরাতের বর্বরতা
সেই মামলার আসামিদের ধরতে গত সোমবার (৪ মে) বিকেলে অভিযানে যায় পুলিশ। আর তখনই ঘটে আরেক দফা তাণ্ডব। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত কেইপিজেডের উত্তর গেইট এলাকায় রাতের অন্ধকারে একদল উত্তেজিত যুবক জড়ো হয়। কেইপিজেডের গেইটের সামনে, স্টপ সাইনের ঠিক পাশে, তারা সংঘবদ্ধ হয়ে তেড়ে আসে— এই দৃশ্য এখন সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট। অভিযুক্তরা ও তাদের স্বজনেরা মিলে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এই হামলায় অন্তত তিনজন পুলিশ সদস্য আহত হন এবং পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।
ফুটেজে দেখা যায়, আইনের লোক সামনে থাকলেও এই যুবকদের মধ্যে কোনো ভয়ের লেশমাত্র নেই। বরং তারা আরও সংগঠিত হয়ে এগিয়ে আসছে। এই স্পর্ধা দেখে শিউরে উঠেছেন খোদ পুলিশ কর্মকর্তারা।
শিল্প পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মিজানুর রহমান জানান, “গাছ কাটা চক্রের সদস্যদের ধরতে গেলে তারা পুলিশের সঙ্গে চরম বিরূপ আচরণ করে। নিরাপত্তারক্ষীদের তথ্যের ভিত্তিতেই পুলিশ এসেছে— এমন ভেবে তারা উল্টো কেইপিজেডের রক্ষীদের সাথেই কয়েক দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।”

মূল হোতা— সালাউদ্দিনের ছায়াচক্র
নিরাপত্তাকর্মী ও পুলিশের তথ্য একটি নামেই এসে মেলে— সালাউদ্দিন। নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত এই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে রাতের আঁধারে পরিচালনা করে আসছে কেইপিজেডের গাছ চুরির এই সংঘবদ্ধ চক্র। কেউ বাধা দিলেই দা, কিরিচ আর রামদা হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন তার অনুসারীরা।
শিল্প পুলিশের আরেক এএসআই বাহার উদ্দিন জানান, “গতকালের হামলায়ও সালাউদ্দিনের চক্রের লোকজনই সরাসরি জড়িত। এর আগেও এই চক্রের সদস্যদের পুলিশ কয়েকবার গ্রেপ্তার করেছিল, কিন্তু তাতেও তাদের অপতৎপরতা থামেনি।”
কেইপিজেডের বেদনা
কোরিয়ান ইপিজেডের সহকারী উপ-মহাব্যবস্থাপক মুশফিকুর রহমান জানান, “গত বৃহস্পতিবার রাতে গাছ কাটতে বাধা দেওয়ায় আমাদের এক কর্তব্যরত নিরাপত্তারক্ষীকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হাত ভেঙে দেওয়া হয়। বিচার চেয়ে মামলা করার পর আসামিদের ধরতে গেলে উল্টো পুলিশকেই নতুন করে হামলার মুখে পড়তে হয়েছে।” শুধু তাই নয়, এই হামলাকারীরা আক্রোশের বশে কেইপিজেডের বেশ কিছু স্থাপনাতেও ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে।
এবার ছাড় নেই— প্রশাসনের কঠোর বার্তা
সিএমপির সহকারী কমিশনার (কর্ণফুলী) জামাল উদ্দীন চৌধুরী জানিয়েছেন, মূলত গাছ কাটাকে কেন্দ্র করেই এই ভয়াবহ সংঘর্ষের সূত্রপাত। সিসিটিভি ফুটেজ নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে ইতোমধ্যে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে পুলিশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেইপিজেড কেবল একটি শিল্পাঞ্চল নয়— এটি চট্টগ্রামের বুকে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের একটি জীবন্ত দলিল। এখানে প্রতিটি গাছ শুধু গাছ নয়— সেটি দেশের ভাবমূর্তি, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা, আর একটি সবুজ আগামীর প্রতিশ্রুতি। সেই গাছ যখন রাতের অন্ধকারে চুরি হয়, যখন বাধা দিতে গিয়ে নিরাপত্তারক্ষীর হাত ভাঙে, যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও হামলার মুখে পড়তে হয়— তখন এটি শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। এই চক্রের মূলোৎপাটন এখন কেবল কেইপিজেডের দাবি নয়— এটি সময়ের দাবি।