সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

মমতার দুর্গে পদ্ম-ঝড়: বিজেপির ঐতিহাসিক জয় ও নতুন সমীকরণ

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৫ মে ২০২৬ | ৯:০১ পূর্বাহ্ন


জনসংঘের জন্মদাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজ্যে ক্ষমতা দখলের যে স্বপ্ন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছিলেন, তা এবার বাস্তব হতে চলেছে। ১৫ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে রাজত্ব করা তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতার মসনদে বসতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।

এই নির্বাচনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভূমিকম্পটি ঘটেছে খোদ বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজ আসনে। সেখানে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে তিনি পরাজিত হয়েছেন। তবে ফল ঘোষণার আগেই মমতা ১০০টির বেশি আসনে ভোট লুট হওয়ার অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

বিজেপির এই জয় আক্ষরিক অর্থেই এক অভাবনীয় চমক। বুথফেরত জরিপগুলোর হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ করে ভোটাররা একচেটিয়াভাবে পদ্মফুলকেই বেছে নিয়েছেন। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলো থেকে তৃণমূলকে পুরোপুরি মুছে ফেলার পাশাপাশি তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত দক্ষিণবঙ্গেও বিজেপির অবিশ্বাস্য উত্থান ঘটেছে।

এমন অভূতপূর্ব পট পরিবর্তনের পেছনে তিনটি বড় কারণকে সামনে আনছেন বিশ্লেষকেরা। প্রথমত, নির্বাচন কমিশনের অতি তৎপরতা। ভোটার তালিকা নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) মাধ্যমে ভুয়া ভোটার ও অনুপ্রবেশকারী বাদ দেওয়ার উদ্যোগ রাজ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে ভোটার সংখ্যা কমলেও আগের চেয়ে ভোট প্রদানের হার অনেক বেড়েছে।

দ্বিতীয়ত, ভোট পরিচালনায় রাজ্য প্রশাসনের ওপর নির্বাচন কমিশনের চরম অনাস্থা। রাজ্য পুলিশের পরিবর্তে আড়াই হাজার কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী ও সিসিটিভি ক্যামেরার কঠোর নজরদারিতে এই ভোট গ্রহণ হয়। পাশাপাশি, তৃণমূলের শীর্ষ নেতাদের ওপর কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলোর (ইডি ও সিবিআই) লাগাতার চাপ রাজ্যের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি পাল্টে দেয়।

তৃণমূল তাদের নির্বাচনী প্রচারে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ ও ‘বহিরাগত’ তত্ত্বকে হাতিয়ার করলেও তা খুব একটা কাজে আসেনি। বরং তৃণমূলের লাগামহীন দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার বিপরীতে মোদি-শাহর ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার এবং ভাতা দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে নারীদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের এই ক্ষমতার পালাবদল বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও নতুন মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছে। ত্রিপুরা ও আসামের পর এবার পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপির শাসন কায়েম হওয়ায় বাংলাদেশের তিন দিকেই তাদের শক্ত ঘাঁটি তৈরি হলো।

তবে সবচেয়ে বড় আশার জায়গাটি হলো দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবল আপত্তির কারণেই এতদিন এই চুক্তি আলোর মুখ দেখেনি। এখন কেন্দ্রে ও রাজ্যে একই দলের সরকার থাকায়, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর অজুহাত আর বাধা হয়ে দাঁড়াবে না বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা। গঙ্গা চুক্তির নবায়নের ক্ষেত্রেও একই ইতিবাচক প্রভাবের আশায় এখন প্রহর গুনবে বাংলাদেশ।