সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

ছাদজুড়ে সবুজ স্বপ্ন, বস্তায় আদা চাষে সফল বিএনপি নেতা

এম মোয়াজ্জেম হোসেন কায়সার | প্রকাশিতঃ ৭ মে ২০২৬ | ১০:৩২ পূর্বাহ্ন


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভেসে ওঠা কয়েকটি ছবিতে দেখা যায়, একটি বাড়ির ছাদে সারি সারি বস্তায় আদা চাষ করা হয়েছে। বস্তাগুলো চালের বস্তার মতো এবং মাটি ভর্তি, উপরে কিছু খড় বা শুকনো পাতা দেওয়া। কয়েকটি বস্তার ভেতর থেকে ছোট ছোট সবুজ আদা গাছ উঁকি দিচ্ছে। সেখানে দাঁড়িয়ে কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলছেন এক শৌখিন বাগানি।

প্রথম দেখায় তাকে সাধারণ কোনো কৃষক মনে হলেও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি স্থানীয় রাজনীতির পরিচিত মুখ মোহাম্মদ আলী। তিনি রাঙামাটি জেলার কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া মডেল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন।

ব্যস্ততার মাঝেও কৃষির প্রতি ভালোবাসা থেকেই মোহাম্মদ আলী তার বাড়ির ছাদ ও আঙিনাজুড়ে ফল এবং মসলাজাতীয় ফসলের ছোট্ট এক সবুজ জগৎ গড়ে তুলেছেন। তার এই অনন্য উদ্যোগের পেছনে রয়েছে শৈশবের স্মৃতি, বাবার অনুপ্রেরণা এবং কৃষির প্রতি গভীর টান।

বেতবুনিয়া মডেল ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী জানান, ছোটবেলা থেকেই গাছপালার প্রতি তার আলাদা ভালোবাসা ছিল। তার বাবা হাজী অলি আহমদ সওদাগর ব্যবসার পাশাপাশি কৃষিকাজও করতেন। মূলত বাবার দেখাদেখিই গাছ লাগানো ও কৃষির প্রতি তার এই আগ্রহ তৈরি হয়।

তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই কৃষিকে ভালোবাসতেন এবং কৃষি ডিপ্লোমা নিয়ে পড়াশোনা করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু বাবাকে হারানোর পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ায় সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।

১৯৯২ সালে রাউজান কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর কর্মজীবনে জড়িয়ে পড়েন মোহাম্মদ আলী। ছোট পরিসরে ফার্নিচারের ব্যবসা শুরু করার পাশাপাশি ছাত্রদলের রাজনীতিতেও সক্রিয় হন তিনি। পরে যুবদল হয়ে বর্তমানে বেতবুনিয়া মডেল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

রাজনীতির পাশাপাশি কৃষিকে আঁকড়ে ধরার বিষয়ে মোহাম্মদ আলী বলেন, দেশের মানুষের জন্যই তারা রাজনীতি করেন। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হলে উৎপাদন বাড়াতে হবে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কৃষিভিত্তিক চিন্তাধারাও তাকে এই কাজে ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বর্তমানে তার ২ হাজার ১০০ স্কয়ার ফিটের ছাদজুড়ে রয়েছে ২০০ বস্তা আদা। দেখা যায়, বস্তাগুলোতে আদা গাছ মাত্র উঠতে শুরু করেছে। পাশাপাশি ২০ থেকে ৩০টি ড্রাগন ফলের গাছ, বিভিন্ন জাতের আম, কমলা ও অন্যান্য ফলজ গাছ লাগিয়েছেন তিনি। বাড়ির আঙিনাতেও গড়ে তুলেছেন লটকন, মাল্টা, জামরুল, আমড়া ও কলাসহ নানা ফলের বাগান।

তবে তার এই সফলতার পথ খুব সহজ ছিল না। আদা চাষে একসময় বড় ধরনের ক্ষতির মুখেও পড়তে হয়েছিল তাকে।

সেই স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, নব্বইয়ের দশকের দিকে আদা চাষে আগ্রহ থেকে প্রায় চার-পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু নানা রোগবালাই ও কম দামের কারণে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বস্তায় আদা চাষের বিষয়টি দেখে তিনি নতুনভাবে এই উদ্যোগ শুরু করেন।

তার ভাষ্যমতে, বস্তায় আদা চাষে রোগবালাই কম হয় এবং পচনের ঝুঁকিও থাকে না। দুই বছর আগে মাত্র ১০০ বস্তা দিয়ে এই চাষ শুরু করেন তিনি। প্রথম বছরে প্রতি বস্তায় প্রায় ৫০ টাকা খরচে এক কেজির মতো আদা উৎপাদন হয়। বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় এবার চাষের পরিমাণ বাড়িয়ে ২০০ বস্তায় উন্নীত করেছেন।

ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে ফলের বাগান গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মোহাম্মদ আলী বলেন, এ লক্ষ্যে ৪০টি পরিবারকে নিয়ে একটি বাগানভিত্তিক উদ্যোগ গড়ার চিন্তা করছেন তিনি। এ বিষয়ে স্থানীয় কৃষি অফিসের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন বলে জানান।

কাউখালী উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. সহিদুজ্জামান জানান, মোহাম্মদ আলী মূলত শখের বশেই ছাদ ও বাড়ির আঙিনায় বিভিন্ন ফল ও মসলাজাতীয় ফসল চাষ করছেন। কৃষি অফিস থেকে তাকে নিয়মিত প্রযুক্তিগত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। রোগবালাই দমন, সার প্রয়োগ ও পরিচর্যার বিষয়েও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

কৃষি কর্মকর্তা মো. সহিদুজ্জামান আরও জানান, এই ছাদ বাগানের আদা চাষ থেকে ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এ বছর প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা লাভ হতে পারে বলে তারা আশা করছেন।

৫৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ আলীর পরিবারেও কৃষির প্রতি এমন আগ্রহ রয়েছে। দুই সন্তানের জনক মোহাম্মদ আলীর এক ছেলে বর্তমানে রাঙামাটি সরকারি কলেজে অনার্স তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।

রাজনীতি, ব্যবসা আর কৃষি—এই তিনটি ক্ষেত্র একসঙ্গে সামলালেও মোহাম্মদ আলীর বিশ্বাস, কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে মানুষ মাটির কাছাকাছি থাকতে পারে। আর সেই টান থেকেই তিনি এখনো আরও বড় এক সবুজ বাগানের স্বপ্ন দেখেন।