সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

বিচার যখন ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধেই দাঁড়ায়

নজরুল কবির দীপু | প্রকাশিতঃ ৭ মে ২০২৬ | ১২:১২ অপরাহ্ন


একটি সংখ্যা দিয়ে শুরু করা যাক। মাত্র তিন।

শতকরা তিন ভাগ। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার এটুকুই। অর্থাৎ একশোটি মামলার মধ্যে সাতানব্বইটিতেই অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতের দরজা পেরিয়ে মুক্ত মানুষ হিসেবে বেরিয়ে আসে। আর ভুক্তভোগী? সে রয়ে যায় বিচারের অপেক্ষায়, যে বিচার হয়তো তার জীবদ্দশায় আসবেই না।

এটি কোনো গল্পের সংখ্যা নয়। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ গবেষণায় উঠে আসা এই তথ্য আমাদের চোখের সামনে একটি নির্মম সত্য তুলে ধরে—আমাদের বিচারব্যবস্থা ঠিক কতটা অসহায়, অথবা বলা ভালো, কতটা উদাসীন, নির্যাতনের শিকার মানুষগুলোর প্রতি।

প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে কি মামলাগুলো মিথ্যা? অনেকে ঠিক এই সরলরৈখিক সিদ্ধান্তে লাফিয়ে পড়েন। “সাজা হয়নি মানে অভিযোগ মিথ্যা ছিল”—এই যুক্তি যতটা সহজ, ততটাই বিপজ্জনক। বাস্তব চিত্রটা সম্পূর্ণ আলাদা। বাস্তবে নারীর ওপর সহিংসতার একটি বিশাল অংশ কখনো আদালত পর্যন্ত পৌঁছায়ই না। সামাজিক কলঙ্কের ভয়, পরিবারের চাপ, নিরাপত্তাহীনতা—এসব দেয়াল পেরিয়ে যে নারী থানায় যাওয়ার সাহস করেন, সে ইতিমধ্যে একটি যুদ্ধ জিতে এসেছেন। কিন্তু সেটাই শেষ যুদ্ধ নয়, বরং সূচনা।

এরপর শুরু হয় আরেক দীর্ঘ লড়াই।

আইনে বলা আছে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি হবে। বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে সাড়ে তিন বছর লাগছে। প্রতিটি মামলায় গড়ে বাইশবার শুনানির তারিখ পড়ছে। বাইশবার। ভাবুন একবার—একজন নির্যাতিত নারীকে বাইশবার আদালতের করিডোরে দাঁড়াতে হচ্ছে, বাইশবার তাকে তার কষ্টের গল্প মনে করতে হচ্ছে, বাইশবার হয়তো অভিযুক্ত বা তার লোকজনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। প্রতিটি তারিখ মানে কাজ ছেড়ে আসা, যাতায়াত খরচ, আইনজীবীর ফি এবং আরও একটু করে ভেঙে পড়া।

বিচার বিলম্বের কারণগুলো কোনো রহস্য নয়। সাক্ষীর অনুপস্থিতি, বারবার সময় প্রার্থনা, তদন্তে গড়িমসি, দুর্বল ফরেনসিক ব্যবস্থাপনা, সাক্ষী সুরক্ষার অভাব—এসব সমস্যা দশকের পর দশক ধরে চিহ্নিত, কিন্তু সমাধান অধরাই রয়ে গেছে। কেন? কারণ এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বিনিয়োগ দরকার, তার প্রতি রাষ্ট্রের মনোযোগ বরাবরই কম।

আইনমন্ত্রী নিজে স্বীকার করেছেন, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগ সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। জাতীয় বাজেটে বিচার বিভাগের বরাদ্দ এতটাই সামান্য যে বিচারকের বেতন থেকে শুরু করে আদালতের ছাদ মেরামত পর্যন্ত সবকিছুতেই টানাটানি। প্রযুক্তি? সেটা তো বিলাসিতা। অথচ এই বিভাগটিই মানুষের সবচেয়ে মৌলিক অধিকার—ন্যায়বিচার—নিশ্চিত করার কথা।

পারিবারিক সহিংসতার কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। চার দেয়ালের ভেতরে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের সাক্ষী সাধারণত থাকে না। প্রতিবেশী হয়তো আওয়াজ শুনেছেন, কিন্তু দেখেননি। পরিবারের লোকজন মামলা করতে নিরুৎসাহিত করেন। শেষ পর্যন্ত আদালতে দাঁড়ানো একাকী একজন নারী, তার মুখের কথা বনাম অভিযুক্তের অস্বীকার—এই লড়াইয়ে প্রমাণের ভার নিতে গিয়ে ভুক্তভোগী প্রায়ই হেরে যান।

এখানে প্রশ্নটা কেবল আইনের নয়, সংস্কৃতিরও। বিচারকদের আরও সংবেদনশীল হতে হবে। একজন নির্যাতিত নারীর সাক্ষ্য দেওয়ার ধরন বা আচরণ স্বাভাবিক সাক্ষীর মতো নাও হতে পারে—ট্রমার প্রভাবে স্মৃতি এলোমেলো থাকে, কণ্ঠস্বর কাঁপে, বিবরণে অসংগতি দেখা দেয়। এটাকে মিথ্যার প্রমাণ হিসেবে না দেখে মানসিক আঘাতের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বোঝার সক্ষমতা বিচারিক ব্যবস্থায় থাকা দরকার।

সমাধান কি নেই? আছে, কিন্তু সেটা একটি সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিচার বিভাগে বাজেট ও জনবল বাড়ানো জরুরি। তদন্ত ও সাক্ষ্য গ্রহণে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা দরকার। সাক্ষী সুরক্ষা আইনের কাগুজে অস্তিত্বকে মাঠের বাস্তবতায় নামিয়ে আনতে হবে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তদন্ত সংস্থা, প্রসিকিউশন ও আদালতের মধ্যে সেই সমন্বয় তৈরি করতে হবে যা এখন প্রায় অনুপস্থিত।

কিন্তু এই সংস্কারের আগেও একটি মানসিক সংস্কার দরকার। রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—সে কার পক্ষে দাঁড়াবে। আইন লেখা আছে ভুক্তভোগীর পক্ষে, কিন্তু বাস্তব কার্যব্যবস্থা প্রায়ই অভিযুক্তের অনুকূলে চলে যায়। মামলার দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা, প্রমাণের দুর্বলতা—এই তিনটি মিলিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেটা কার্যত নির্যাতিত মানুষকে বলে দেয়: তোমার লড়াই এখানে শেষ করো।

তিন শতাংশ সাজার হার শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি প্রতিটি ভুক্তভোগীকে পাঠানো একটি বার্তা—তোমার বিচার হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র তিন ভাগ। এই বার্তা বদলানোই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।