সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

মাতামুহুরীতে চোরাবালির গর্তে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল, তবু থামছে না অবৈধ বালু উত্তোলন

এম. জিয়াবুল হক | প্রকাশিতঃ ১১ মে ২০২৬ | ১১:২৬ পূর্বাহ্ন


কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার মাতামুহুরী নদীতে শ্যালো মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে চোরাবালির গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে নদীর এসব মোহনায় গোসল করতে নেমে চোরাবালির গর্তে আটকে পড়ে মৃত্যুর মিছিল ক্রমাগত বাড়ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে মাতামুহুরী নদীতে বালুখেকো চক্রের সৃষ্ট চোরাবালিতে আটকে পড়ে অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। মারা যাওয়াদের বেশিরভাগই শিশু-কিশোর ও শিক্ষার্থী। এর মধ্যে দুই মাস আগে চকরিয়া পৌরসভার হালকাকারা মৌলভীরচর মাতামুহুরী সেতু পয়েন্টে গোসল করতে নেমে দুই স্কুলছাত্রীর মৃত্যু হয়।

সর্বশেষ শুক্রবার সকালে চকরিয়া পৌরসভার বাটাখালী খোন্দকারপাড়া মসজিদ এলাকায় মাতামুহুরী নদী পার হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে যাওয়ার সময় নদীর মাঝখানে চোরাবালিতে আটকে মারা যায় নুর ইলাহি নাদিম নামের এক ছাত্র। নিহত নুর ইলাহি নাদিম চকরিয়া উপজেলায় কর্মরত সাংবাদিক অলিউল্লাহ রনির মেজ ছেলে এবং সে চকরিয়া কোরক বিদ্যাপীঠ স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিল।

চকরিয়া উপজেলা পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মাহমুদ জানিয়েছেন, মাতামুহুরী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন পরিবেশ আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। প্রবহমান নদীতে শ্যালো মেশিন বসিয়ে কিংবা নদীর চর কেটে বালু উত্তোলনের কারণে পরিবেশগতভাবে নদীর শাসন ও সংরক্ষণ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। অথচ এভাবে বালু উত্তোলনের জন্য সরকারি কোনো সংস্থার অনুমোদন নেই।

মাহমুদুর রহমান মাহমুদ আরও বলেন, পরিসংখ্যান করে দেখা গেছে, মাতামুহুরী নদীর অন্তত ২০টির অধিক পয়েন্টে শ্যালো মেশিন বসিয়ে কতিপয় চক্র দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, নদীর এক স্থান থেকে বালু উত্তোলনের কিছুদিন পর বালু শেষ হয়ে গেলে চক্রটি পুনরায় নতুন জায়গায় গিয়ে উত্তোলন শুরু করে। এভাবে নদীজুড়ে শক্তিশালী মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তলদেশ খালি হয়ে গিয়ে চোরাবালির গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়।

সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান মাহমুদ দাবি করেন, নদীর তীরের ঘাট কিংবা মোকামে প্রতিদিন এলাকাভিত্তিক শত শত মানুষ গোসল করেন এবং প্রাত্যহিক কাজ সারেন। অনেকে সাঁতার কেটে নদীর ওপারে চলে যান। এভাবে ছোট শিশু-কিশোর, বিশেষ করে স্কুল-মাদরাসা পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে গোসল করতে নেমে বালু লুটেরা চক্রের তৈরি করা মরণফাঁদে বা চোরাবালির গর্তে আটকে পানিতে তলিয়ে যায়।

তিনি উল্লেখ করেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে অন্তত সাতজন গোসল করতে নেমে ডুবে মারা গেছেন। এমনকি ২০১৮ সালের ১৪ জুলাই মাতামুহুরী নদীর চরে ফুটবল খেলে গোসল করতে নেমে চকরিয়া গ্রামার স্কুলের পাঁচজন মেধাবী শিক্ষার্থী একসঙ্গে মারা যায়। এভাবে মাতামুহুরী নদীতে প্রতিবছর মৃত্যুর মিছিল বেড়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন জোরালো অভিযান চালিয়ে পাইপ বা মেশিন জব্দ ও জরিমানা ছাড়া এই দৌরাত্ম্য বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন। সে কারণেই মাতামুহুরী নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন এখনও বহাল তবিয়তে চলছে।

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা)-এর চকরিয়া উপজেলা কমিটির সভাপতি সাংবাদিক একেএম বেলাল উদ্দিন বলেন, প্রশাসনের বারবার অভিযানের পরও মাতামুহুরী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে চকরিয়া পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ড আমানপাড়া পয়েন্টে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন একেবারেই থামছে না।

স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ, কতিপয় প্রভাবশালী চক্র রাতের অন্ধকারে নদীতে শ্যালো মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন চালাচ্ছে। আবার সারা রাত ধরে ট্রাকের মাধ্যমে সেই বালু পাচার করছে। রাতভর বালুবাহী ট্রাক চলাচলের কারণে বিকট শব্দে জনজীবন যেমন অতিষ্ঠ, তেমনি চিরিঙ্গা মাতামুহুরী সেতুর নিচ থেকেও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এ অবস্থায় কৃষিজমি ও কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিরিঙ্গা মাতামুহুরী সেতু হুমকির মুখে পড়ছে। এলাকাবাসী জানান, দিনের পর দিন এই কর্মকাণ্ড চললেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জোরালো অভিযান না থাকায় সাধারণ মানুষের মাঝে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

পরিবেশ সচেতন মহলের দাবি, প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত চলে এই তাণ্ডব। অন্যদিকে বালুবোঝাই ভারী ট্রাক চলাচলের কারণে রাস্তাঘাট ভেঙে গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থায় মাতামুহুরী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, মাতামুহুরী নদীতে শ্যালো মেশিন বসিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়টি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট হওয়ায় ইতোমধ্যে চকরিয়া থানা পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়ে নদীর বিভিন্ন মোকামে অভিযান পরিচালনা করেছে। দুজনকে গ্রেপ্তার করে পরিবেশ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দিয়ে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। ওসি মোহাম্মদ মনির হোসেন আরও বলেন, উপজেলা প্রশাসন যখনই চাইবে, বালু লুটেরা চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধে পুলিশ সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।

এ ব্যাপারে চকরিয়া উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার রুপায়ন দেব বলেন, মাতামুহুরী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে ইতোপূর্বে অসংখ্যবার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে শ্যালো মেশিন ও পাইপ জব্দ করে ধ্বংস করা হয়েছে। বালু জব্দ করে নিলামে দেওয়া হয়েছে এবং জড়িতদের জেল-জরিমানাও করা হয়েছে।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুপায়ন দেব আরও বলেন, এখন জড়িত চক্রের লোকজন নদী থেকে বালু উত্তোলন ও পাচারের কৌশল বদলে ফেলেছে। তারা প্রশাসনকে ফাঁকি দিতে রাতের আঁধারে এসব অবৈধ কারবার চালাচ্ছে। তারপরও নতুন করে যেখানে বালু উত্তোলন হচ্ছে, সেখানেই চকরিয়া উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত কঠোর অভিযান পরিচালনা করবে।