সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা

সাইফুল আযম | প্রকাশিতঃ ১১ মে ২০২৬ | ১১:৫৫ পূর্বাহ্ন


‘মা’—বাংলা ভাষার সবচেয়ে ছোট, অথচ সবচেয়ে ভারী, সবচেয়ে আনন্দের এবং সবচেয়ে স্নেহমাখা একটি শব্দ। এই একটিমাত্র শব্দের যে বিশালতা এবং গভীরতা, পৃথিবীর আর কোনো কিছুর সাথেই তার তুলনা চলে না। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় মাকে আম্মু, মম বা মাতা—যে নামেই ডাকা হোক না কেন, ‘মা’ শব্দের আদি ও অকৃত্রিম অর্থ হলো নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও পরম আশ্রয়। ইসলাম ধর্মে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।’ মায়ের এই অসীম মর্যাদার বিষয়টি আরও সুনিশ্চিত হয় আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি সুপরিচিত হাদিস থেকে। এক সাহাবী যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, পৃথিবীতে তার কাছে সবচেয়ে বেশি সদাচরণ পাওয়ার অধিকারী কে? নবীজি পরপর তিনবার বলেছিলেন, ‘তোমার মা’, এবং চতুর্থবার বলেছিলেন, ‘তোমার বাবা’। এক বাক্যেই তাই অত্যন্ত সুন্দরভাবে বোঝা যায়, সন্তানের জীবনে মায়ের সম্মান ও অধিকার কতটা উঁচুতে আসীন।

আমাদের দেশের বাউল সাধক ও লোকগানের শিল্পীদের কণ্ঠে একটি গান প্রায়ই শোনা যায়, “মায়ের এক ধার দুধের দাম, গায়ের চামড়া কাটিয়া পাপোশ বানাইয়া দিলেও শোধ হবে না। এমন দরদি ভবে কেউ হবে না আমার মা গো।” এই গানের কথাগুলো অত্যন্ত সাধারণ গ্রামীণ ভাষায় রচিত হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক ও গভীর। এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সন্তানের জন্য মায়ের ভালোবাসা কতটা মধুর এবং মায়ের ঋণ কতটা অপরিশোধ্য।

একজন মা তার সন্তানকে দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করেন। এই দীর্ঘ সময়ে তাকে সহ্য করতে হয় অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক কষ্ট। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রসববেদনা হলো মানবদেহের সহ্য করা অন্যতম তীব্র একটি ব্যথা, যাকে অনেকেই একসাথে শরীরের অনেকগুলো হাড় ভেঙে যাওয়ার মতো ভয়াবহ যন্ত্রণার সমতুল্য বলে বর্ণনা করে থাকেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত যন্ত্রণার পরও যখন নবজাতক প্রথমবার কেঁদে ওঠে, মা তার জীবনের সমস্ত কষ্ট ভুলে গিয়ে সন্তানকে বুকে টেনে নেন। গর্ভাবস্থার ওই দীর্ঘ সময়টাতে মা ঠিকমতো খেতে পারেন না, শান্তিতে ঘুমাতে পারেন না। তবুও সন্তানের একটু হাসিমুখ দেখার জন্য তিনি সব কিছু হাসিমুখে মেনে নেন। সন্তানের কোনো বিপদ হলে বা কিছু হলে পৃথিবীর আর কেউ খবর রাখুক বা না রাখুক, মায়ের মন ঠিকই আগে থেকে টের পেয়ে যায়। এটি যেন স্রষ্টাপ্রদত্ত এক ঐশ্বরিক নাড়ির টান।

সমাজের চোখে একজন মানুষ চোর, ডাকাত বা ছিনতাইকারী হতে পারে। অপকর্মের জন্য সবাই তাকে ঘৃণার চোখে দেখতে পারে, সমাজ তাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। কিন্তু একজন মা কখনোই তার সন্তানকে দূরে ঠেলে দেন না। হয়তো লজ্জায় তিনি সমাজের মানুষের কাছে মুখ দেখাতে পারেন না, কিন্তু গোপনে ঠিকই ওই বিপদগামী সন্তানের খবরাখবর রাখেন এবং তার সুস্থ জীবনের জন্য চোখের পানি ফেলেন।

অন্যদিকে, সমাজে যারা ‘রত্নগর্ভা’ হিসেবে পরিচিত, সেই মায়েদের ত্যাগের কথা বলে শেষ করা যাবে না। বিখ্যাত বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন ছোটবেলায় স্কুল থেকে মেধা নেই বলে বিতাড়িত হয়েছিলেন। কিন্তু তার মায়ের অকৃত্রিম বিশ্বাস, শিক্ষা ও অনুপ্রেরণায় তিনি বড় হয়ে বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার করে পুরো পৃথিবীকে আলোর পথ দেখিয়েছেন। এটিই একজন রত্নগর্ভা মায়ের প্রকৃত উদাহরণ। আমাদের চারপাশে এমন অনেক মা আছেন, যারা নিজেরা দুবেলা পেট ভরে খেতে না পারলেও অনেক কষ্ট করে সন্তানদের বড় করেছেন। আজ সেই সন্তানেরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বড় বড় দপ্তরে অধিষ্ঠিত হয়ে মায়ের মুখ উজ্জ্বল করেছেন।

কিন্তু এত আলো ও ভালোবাসার গল্পের মাঝেও সমাজের কিছু ব্যতিক্রমী ও অন্ধকার দিক আমাদের চরমভাবে ব্যথিত করে। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আমরা প্রায়ই খবর পাই যে, সদ্য ভূমিষ্ঠ নবজাতককে রাস্তার ধারের ঝোপঝাড়ে বা ময়লার স্তূপে ফেলে যাওয়া হয়েছে। এই অবুঝ শিশুগুলোরও তো মা-বাবা থাকে! ওই পাষাণ মা-বাবার জন্য শুধু করুণা আর আফসোসই হয়। আবার অনেকেই গর্ভে ভ্রূণ আসার দুই-তিন মাস পর অবলীলায় তা নষ্ট করে ফেলেন। অথচ যে মা একবার তার সন্তানকে হারিয়েছেন, শুধু তিনিই বোঝেন সন্তান হারানোর বেদনা কতটা মর্মান্তিক।

একটি শিশুর জীবনের প্রথম শিক্ষক হলেন তার মা। আধো আধো কণ্ঠে শিশুটি যখন ‘মা’ বলে ডাকতে শেখে, মা তখন তাকে কথা বলতে শেখান, নিজের হাতে খাইয়ে দেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেন। মায়ের হাত ধরেই শিশুটি একদিন বড় হয়। সেই শিশুটি যখন বড় হয়ে বিশাল বড় দপ্তরে চাকরি করে, বড় ব্যবসা করে এবং বিশাল অট্টালিকা বা ফ্ল্যাট তৈরি করে, তখন সেই বড় ফ্ল্যাটের কোনো এক কোণে ওই জন্মদাত্রী মা-বাবার জায়গা হয় না। এই ফ্ল্যাটগুলো এত বড় যে এপার-ওপার দেখা যায় না, অথচ সেখানে মা-বাবার পুরনো আলমারি বা পুরনো জিনিসপত্রের কোনো স্থান নেই। অনেক সময় এমন হৃদয়বিদারক কথাও শুনতে হয় যে, বৃদ্ধ মা-বাবাকে উদ্দেশ্য করে সন্তান বলছে, “ভিক্ষুকের মতো তুমি আমার বাসার সামনে কেন এসেছ? আমি ছাড়া কি তোমার আর কোনো সন্তান নেই?” মা-বাবা হয়তো ফেরেশতা নন, মানুষ হিসেবে তাদেরও কিছু ভুলত্রুটি থাকতে পারে। কিন্তু মা-বাবাকে তাদের শেষ বয়সে ভরণপোষণ না করা, তাদের পথে ফেলে দেওয়া একটি বড় ধরনের আইনগত ও ধর্মীয় অপরাধ।

আমরা প্রায়ই বিভিন্ন পত্রিকা, ফেসবুক বা ইউটিউবের মাধ্যমে দেখতে পাই যে, সমাজের অনেক প্রতিষ্ঠিত ও নামিদামি ব্যক্তির মা-বাবার জীবনের শেষ ঠিকানা হয় কোনো এক বৃদ্ধাশ্রম। যে সন্তানেরা ছোটবেলায় অন্ধকারে ভয় পেলে বা ভাত খেতে না চাইলে মায়ের আঁচল আঁকড়ে ধরত, মাকে না দেখলে ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদত, আজ তারা সমাজে অনেক ক্ষমতাশালী। তাদের কথায় এখন সমাজ ওঠে আর বসে, অথচ তাদের মা-বাবার স্থান হয় নিঃসঙ্গ বৃদ্ধাশ্রমে। কিছুদিন আগের একটি ঘটনা খুবই শিক্ষণীয়। এক স্কুলের বনভোজনে গিয়ে একটি ছোট শিশু সেখানকার বৃদ্ধাশ্রমে তার দাদিকে দেখতে পায়। বাড়িতে ফিরে মেয়েটি তার বাবাকে বলে, “আমিও যখন বড় হব, তোমাদেরকে ওই দাদির কাছে রেখে আসব।” এই কথাটি একটি শিশুর মুখ থেকে বেরিয়ে এলেও এর গভীরতা অনেক। তাই সময় থাকতে দাঁতের মর্যাদা দিতে শিখুন। মা-বাবা বেঁচে থাকতে তাদের যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান দিন। তাদের প্রতি খেয়াল রাখুন। মা-বাবার সাথে মান-অভিমান থাকতে পারে, কিন্তু তাদের ভরণপোষণ ও সম্মান দেওয়া সন্তানের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। অন্যথায় আপনি ‘সন্তান’ নামের কলঙ্ক।

সবচেয়ে আক্ষেপের বিষয় হলো আজকের দিনের মেকি ভালোবাসা। ‘মা দিবস’ এলে অনেকেই মায়ের সাথে সুন্দর সুন্দর ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন। “মাকে অনেক ভালোবাসি,” “মাকে অনেক মিস করি”—এমন নানা আবেগঘন কথায় ভরিয়ে দেন ফেসবুকের পাতা। কিন্তু বছরের বাকি দিনগুলোতে মায়ের কোনো খবর থাকে না।

পরিশেষে প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী নচিকেতার সেই বিখ্যাত গানের কয়েকটি লাইন দিয়ে শেষ করছি:
“ছেলে আমার মস্ত মানুষ, মস্ত অফিসার
মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার-ওপার।
নানা রকম জিনিস আর আসবাব দামি দামি
সবচেয়ে কম দামি ছিলাম একমাত্র আমি।
ছেলের আমার আমার প্রতি অগাধ সম্ভ্রম
আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম।”

আসুন, লোকদেখানো ভালোবাসা পরিহার করি। যারা সত্যি সত্যি মাকে ভালোবাসেন, তারা বছরের একটি দিন নয়, বরং ৩৬৫ দিনই মাকে ভালোবাসেন এবং সম্মান করেন।

লেখক: সহকারী শিক্ষক, কাইচতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বান্দরবান সদর।