সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

দখলমুক্ত সোনাদিয়ার ৫০ একর বনভূমি, ২৫ কটেজ উচ্ছেদে আতঙ্ক

মহেশখালী (কক্সবাজার) প্রতিনিধি | প্রকাশিতঃ ১২ মে ২০২৬ | ১২:৪৯ পূর্বাহ্ন


কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া এলাকায় ২৮০ একর সরকারি বনভূমি দখল করে গড়ে ওঠা অন্তত ৫০টি কটেজ ও রিসোর্টের মধ্যে ২৫টি গুঁড়িয়ে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগ। বন বিভাগের নীরবতার সুযোগ নিয়ে এসব অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছিল। মহেশখালী সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবু জাফরের নেতৃত্বে শনিবার সোনাদিয়ার পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ায় এই সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানের ফলে বনভূমির প্রায় ৫০ একর সরকারি খাসজমি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবু জাফর মজুমদার।

আবু জাফর মজুমদার আরও জানান, স্থানীয়দের সহযোগিতায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন এসে সোনাদিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের ইজারা বা বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই বন বিভাগের খাসজমি দখল করে অবৈধভাবে কটেজ ব্যবসা চালাচ্ছিল। খবর পেয়ে শনিবার সকাল থেকে পূর্ব ও পশ্চিম সোনাদিয়ায় উপজেলা প্রশাসনের সাথে বাংলাদেশ নৌবাহিনী, মহেশখালী থানা পুলিশ, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বন বিভাগ এবং পরিবেশ অধিদপ্তর মিলে প্রায় ১৫০ জনের একটি আভিযানিক দল এই সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে।

প্রথম দিনের অভিযানে বন কেটে তৈরি করা একাধিক কটেজ, বাঁশ-কাঠের শেড এবং টিনশেড স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পর্যটকদের জন্য তৈরি অস্থায়ী কটেজগুলোর বৈদ্যুতিক সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের আপত্তি ও আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকার পরও দখলদাররা স্থাপনা না সরানোয় এই যৌথ অভিযান চালানো হয়েছে বলে এই কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন।

একসময় সোনাদিয়া দ্বীপে ৫৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ১৫২ প্রজাতির শামুক, ২১ প্রজাতির কাঁকড়া, ৯ প্রজাতির চিংড়ি, ২০৭ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, ১২ প্রজাতির উভচর, ১৯ প্রজাতির সরীসৃপ ও ২০৬ প্রজাতির পাখির অভয়ারণ্য ছিল। এ ছাড়া জীববৈচিত্র্যের দ্বীপ হিসেবে পরিচিত প্রায় নয় বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপটিতে রয়েছে ম্যানগ্রোভ বন, উপকূলীয় বনভূমি, সাগরের নীল জলরাশি, কেয়া বন, লাল কাঁকড়া, বিভিন্ন পশুপাখি ও কাছিমের ডিম পাড়ার স্থানসহ বিলুপ্তপ্রায় বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল। এই দ্বীপের প্রায় শত একর জমি দখল করেই অবৈধ দখলদাররা গড়ে তুলেছিল বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা বা কটেজ।

অন্যদিকে অভিযানের খবরে সোনাদিয়া দ্বীপের কটেজ মালিকদের মাঝে চরম আতঙ্ক ও বেকায়দা ভাব দেখা গেছে। উচ্ছেদের ভয়ে শনিবার সকাল থেকেই অনেকে নিজেদের আসবাবপত্র ও ঘরবাড়ির মালামাল দ্রুত সরিয়ে নিতে শুরু করেন। নিজেদের কটেজগুলো ভেঙে সরিয়ে নেওয়ার সময় কয়েকজন কটেজ মালিককে দূর থেকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়। সেখানকার কয়েকজন মালিক আক্ষেপ করে বলেন, তাদের যদি আগে থেকে একটু সময় দেওয়া হতো বা থাকার অন্য কোনো ব্যবস্থা করা হতো, তবে হয়তো আজ তাদের পথে বসতে হতো না। হঠাৎ এই অভিযানে অনেকের রুটি-রুজির পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।

সরকারি খাসজমি উদ্ধার ও দ্বীপের পরিবেশ সুরক্ষায় পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযান প্রসঙ্গে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবু জাফর মজুমদার বলেন, দ্বীপের পরিবেশ এবং সরকারি ভূসম্পত্তি রক্ষায় প্রশাসন সম্পূর্ণ আপসহীন। তাদের মূল লক্ষ্য হলো দ্বীপের প্রকৃত রূপ ফিরিয়ে আনা। কোনো ধরনের প্রভাবশালী মহল বা অবৈধ দখলদারকে এই ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। কটেজ উচ্ছেদের মাধ্যমে প্রশাসন তাদের এই কার্যক্রম শুরু করেছে। যারা দূর থেকে দালালের মাধ্যমে জালিয়াতি করে স্থাপনা তৈরি করেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।