সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

মুখস্থবিদ্যা ও সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১২ মে ২০২৬ | ৬:২৬ অপরাহ্ন


চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কর্মসংস্থানের নতুন বাজারে প্রবেশ করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মুখস্থবিদ্যা ও সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা ও উদ্ভাবনের দিকে আরও বেশি মনোযোগী হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।

মঙ্গলবার সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘ট্রান্সফর্মিং হায়ার এডুকেশন ইন বাংলাদেশ: রোডম্যাপ টু সাসটেইনেবল এক্সিলেন্সি’ শীর্ষক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চাহিদা অনুযায়ী প্রচলিত ধারার শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। শিক্ষা শুধু ব্যক্তির পরিবর্তনের জন্যই নয়, বরং বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং বিশ্বমানের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা তৈরির প্রধান নিয়ামক। তাই উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ গড়ে তুলতে হবে এবং কারিকুলাম প্রণয়নে শিল্পখাতের চাহিদাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ডাটা সায়েন্সের সঙ্গে বায়োলজি বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে সমাজবিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটছে। এই সংযোগের ফলে জ্ঞানের সীমানা প্রতিনিয়ত প্রসারিত ও গতিশীল হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী বের হলেও অনেকেই বেকার থাকছেন। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতা অর্জন করতে না পারাই উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করতে বর্তমান সরকার অ্যাপ্রেন্টিসশিপ, ইন্টার্নশিপ এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া বিষয়ে সহযোগিতা বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় শহরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে এই কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি হাতে-কলমে শিক্ষা লাভ করে শিক্ষার্থী অবস্থাতেই কর্মদক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হবেন, যাতে শিক্ষাজীবন শেষে তাদের বেকার থাকতে না হয়।

র‍্যাঙ্কিংয়ের ক্ষেত্রে গবেষণা, প্রকাশনা, সাইটেশন ও উদ্ভাবনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, শুধু পুঁথিগত শিক্ষাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা ও উদ্ভাবনে মনোযোগ না দিলে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকা কষ্টকর হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এ সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স ও অটোমেশন, ইন্টারনেট অব থিংসের মতো প্রযুক্তি মানুষের চিন্তার জগৎ ও কর্মক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করছে। এটি যেমন প্রথাগত চাকরির বাজারে বেকারত্ব বাড়াচ্ছে, তেমনি তৈরি করছে নিত্যনতুন কর্মসংস্থানও।

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনোভেটিভ বিজনেস আইডিয়া বাণিজ্যিকীকরণ করতে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় সিড ফান্ডিং বা ইনোভেশন গ্রান্ট প্রদানের উদ্যোগের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ক্যাম্পাস থেকে ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা তৈরি করাই এর মূল উদ্দেশ্য। সরকার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইনস্টিটিউট’ এবং সায়েন্স পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বক্তব্যের একপর্যায়ে ব্রিটিশ লেখক টম উইনের একটি বিখ্যাত মন্তব্য উদ্ধৃত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিশ্বে বহুল ব্যবহৃত ট্যাক্সি কোম্পানি উবারের নিজের কোনো ট্যাক্সি নেই, অপ্রতিদ্বন্দ্বী সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুক নিজে কনটেন্ট তৈরি করে না, বিশ্বের বৃহত্তম অনলাইন বিজনেস প্ল্যাটফর্ম আলিবাবার কোনো মজুত পণ্য নেই এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় আবাসন প্রোভাইডার এয়ারবিএনবির নিজস্ব কোনো রিয়েল এস্টেট নেই। ইনোভেটিভ আইডিয়া দিয়ে তারা যার যার ক্ষেত্রে বিশ্ব শাসন করছে, যা প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানের বড় উদাহরণ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাইদের গবেষণা ও উদ্ভাবন কার্যক্রমে পৃষ্ঠপোষকতা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ, আর অ্যালামনাইরা হলো তার মেরুদণ্ড। দেশে-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত অ্যালামনাইদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা ও গবেষণা উন্নয়নে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য তিনি উপস্থিত শিক্ষাবিদদের প্রতি বিনীত আহ্বান জানান।

ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তরুণদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর হাজারো প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমান সরকার একটি জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র এবং সমাজ গড়তে চায়। তবে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজের আবহমানকালের ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ যেন হারিয়ে না যায়, সে বিষয়ে তিনি শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীসহ সব শ্রেণিপেশার মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পক্ষ থেকে ক্রেস্ট উপহার দেন কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই কর্মশালায় আরও বক্তব্য রাখেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক এবং ইউজিসির সচিব ফখরুল ইসলাম।