এই সংখ্যাটা মাথায় রাখুন। পড়তে পড়তে ভাবুন—এই টাকায় কতটি হাসপাতাল হতো। কত গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছাত। কত শিশু স্কুলে যেত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ২০২৪ সালের নভেম্বরে ব্রিটিশ পত্রিকা ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছিলেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে এস আলম গোষ্ঠী এই পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ থেকে পাচার করেছে।
সেই মানুষটি এখন দেশ ছেড়েছেন। আর এখন ছাড়তে চাইছেন দেশের নাগরিকত্বও।
কিন্তু বাংলাদেশ ছাড়বে না তাঁকে। অন্তত এখনই নয়।
কাগজের ফাঁদ, আইনের দেয়াল
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ। বিএনপি সরকার তখন নতুন। এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি আবেদন পাঠালেন। শুধু নিজের নয়—স্ত্রী ফারজানা পারভীন, দুই ছেলে আশরাফুল আলম ও আসাদুল আলম মাহিরের নামেও।
আবেদনের বিষয়: বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ।
এটা তাঁর প্রথম চেষ্টা নয়। ২০২০ সালেও একবার এই আবেদন করেছিলেন। সেবার আওয়ামী লীগ সরকার মঞ্জুর করেছিল বলে তাঁর আইনজীবীরা দাবি করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২০ সালের ১৯ জুলাইয়ের একটি স্মারকও হাজির করা হয় প্রমাণ হিসেবে।
কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ নয়।
গত বছরের নভেম্বরে ইসলামী ব্যাংক হাইকোর্টে রিট করে। সেই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আওয়ামী লীগ আমলে জারি করা সেই স্মারক স্থগিত করেন। ফলে প্রশ্নটা এখনো ঝুলে আছে—সাইফুল আলম আসলে বাংলাদেশের নাগরিক, নাকি নন?
আর এই ঝুলন্ত প্রশ্নের মধ্যেই তিনি আবার আবেদন করেছেন।
তিন দেশ, তিন পাসপোর্ট, এক রহস্য
সাইফুল আলম কোন দেশের নাগরিক?
প্রশ্নটা সহজ মনে হলেও উত্তর জটিল।
২০২০ সালে তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছিলেন সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব পেয়েছেন বলে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে সেই সাইপ্রাস পাসপোর্টের কপিও আছে—২০১৬ সালে ইস্যু করা।
কিন্তু ২০২৪ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে মামলা করতে গিয়ে তিনি নিজেকে পরিচয় দিলেন সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে।
তাহলে সাইপ্রাস গেল কোথায়?
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব পেতে সাধারণত আগের নাগরিকত্ব ছাড়তে হয়। কিন্তু সাইফুল আলম সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব কবে ছেড়েছেন, কবে সিঙ্গাপুরের নাগরিক হয়েছেন—এ তথ্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে নেই।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস এ বিষয়ে তাঁর আইনি প্রতিনিধিদের জিজ্ঞেস করেছিল। কোনো উত্তর মেলেনি।
সিঙ্গাপুর সরকারও চুপ।
একটি পরিবার, তিনটি দেশের কাগজ, এবং এক ধূসর রহস্য।
কেন এখন, কেন এত তাড়া
আইনজীবী এম আবদুল কাইয়ূম সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। ইসলামী ব্যাংকের হয়ে হাইকোর্টে রিটের শুনানি করেছেন তিনি।
তিনি সরাসরি প্রশ্নটা তুললেন—সাইফুল আলম যদি ২০২০ সালেই নাগরিকত্ব ছেড়ে দিয়ে থাকেন, তাহলে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের নাগরিক পরিচয়ে কীভাবে ব্যাংকঋণ নিলেন?
গত বছর চট্টগ্রামে ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলায় তিনি নিজেই নিজেকে বাংলাদেশের নাগরিক দাবি করেছেন। আর এখন নাগরিকত্ব ত্যাগ চাইছেন।
এই আইনজীবীর বিশ্লেষণ স্পষ্ট: নাগরিকত্ব ছেড়ে দিলে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার দায় এড়ানো সহজ হবে। সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ চুক্তির সুরক্ষা দাবি করা যাবে।
সহজ কথায়: পালানোর রাস্তা চওড়া করা।
আন্তর্জাতিক আদালতে লড়াই
গত অক্টোবরে সাইফুল আলম বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি কেন্দ্রে মামলা করেছেন। অভিযোগ, বাংলাদেশ সরকার তাঁর সম্পদ জব্দ করে, তদন্ত চালিয়ে শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি করেছে।
মামলার ভাষা আরও চমকপ্রদ। বলা হয়েছে, সরকার ‘পরিকল্পিতভাবে’ তাঁদের বিরুদ্ধে ‘প্ররোচনামূলক মিডিয়া অভিযান’ চালিয়েছে।
অর্থাৎ, সাংবাদিকরা যখন পাচারের খবর লিখেছেন, সেটাও নাকি ষড়যন্ত্র।
আগামী ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্রে মামলার শুনানি। বাংলাদেশ সরকার লড়বে। অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় প্রস্তুতি নিচ্ছে। ব্রিটিশ একটি আইনি প্রতিষ্ঠানকেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেছেন, “সরকার এ মামলায় লড়তে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে।”
সাত সংস্থার কাছে চিঠি
নাগরিকত্বের আবেদন মঞ্জুর করা যাবে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গত ৩ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাতটি সরকারি সংস্থাকে চিঠি দিয়েছে। দুদক, নির্বাচন কমিশন, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, পুলিশের বিশেষ শাখা, এনএসআই, ডিজিএফআই।
জানতে চাওয়া হয়েছে—মামলা আছে কি না, ঋণ আছে কি না, আবেদন মঞ্জুর হলে রাষ্ট্রের কী ক্ষতি হতে পারে।
এখনো সব সংস্থার জবাব আসেনি।
ততক্ষণে সাইফুল আলম অপেক্ষায়। বিদেশে। দেশ যাকে এখনো নাগরিক মনে করে।
পাসপোর্ট আছে, ফেরার পথ নেই
ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর জানিয়েছে, সাইফুল আলম, তাঁর স্ত্রী ও ছেলে আসাদুল আলমের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হলেও সেগুলো এখনো সক্রিয়। ডেটাবেজে তথ্য আছে।
কিন্তু আরেক ছেলে আশরাফুল আলমের পাসপোর্টের কোনো তথ্যই নেই অধিদপ্তরে।
কাগজে আছেন। দেশে নেই।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে সাইফুল আলম আর দেশে পা রাখেননি। দুদক তদন্ত করছে, এনবিআর সম্পদ খুঁজছে, হাইকোর্টে মামলা চলছে।
আর তিনি বিদেশ থেকে কাগজ পাঠাচ্ছেন—দেশের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে।
যে প্রশ্নের উত্তর নেই
এস আলমের ফোনে একাধিকবার কল করা হয়েছে। ধরেননি। ইমেইল পাঠানো হয়েছে। সাড়া নেই।
তাঁর নীরবতার ভাষা অনেক কিছু বলে।
এক লাখ বিশ হাজার কোটি টাকার হিসাব কোথায়? কোন দেশে গেছে সেই অর্থ? কীভাবে ফিরবে?
সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিয়ে কি শুধু কাগজে নাম কেটে দেওয়া সম্ভব?
বাংলাদেশ বলছে—না।
অন্তত এখনই নয়।