সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

পরিবার হারিয়ে হাজারো পরিবারের আশ্রয় হলেন যিনি

এম মাঈন উদ্দিন | প্রকাশিতঃ ২৩ মে ২০২৬ | ১০:১২ অপরাহ্ন


১৯৭১ সালের ৬ এপ্রিল। চট্টগ্রাম শহর থেকে বাড়ি ফেরার পথ। একটি পরিবার, স্বপ্ন নিয়ে ফিরছে নিজেদের গ্রামে। হঠাৎ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অতর্কিত গুলিবর্ষণ। মুহূর্তে সব শেষ হয়ে গেল। বাবা, মা, দুই ভাই, একমাত্র বোন। একসাথে পাঁচজন। শহীদ হয়ে গেলেন সবাই।

বেঁচে গেলেন শুধু একটি ছেলে। নাম তার এস. এ. ফারুক।

সেই দিনের ক্ষত কখনো শুকায়নি। কিন্তু সেই ক্ষতই তাকে শিখিয়েছে মানুষের মূল্য। বাবার শেষ কথাগুলো হয়ে উঠেছে জীবনের ব্রত। বাবা চেয়েছিলেন ছেলে ডাক্তার হবে, গ্রামে গিয়ে মানুষের সেবা করবে।

আজ চার দশক পর ডা. এস. এ. ফারুক শুধু একজন শিশু বিশেষজ্ঞ নন। তিনি মিরসরাই ও ফটিকছড়ির মানুষের কাছে পরিচিত “মানবিক ডাক্তার” হিসেবে। যে মানুষটি তার পেশা, সম্পত্তি, এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উৎসর্গ করেছেন অন্যের কল্যাণে।

যে হাসপাতাল শুধু হাসপাতাল নয়

মিরসরাইতে তার প্রতিষ্ঠিত “সেফা ইনসান হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার” কেবল একটি চিকিৎসা কেন্দ্র নয়। এটি হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের নির্ভরতার ঠিকানা। এখানে শিশু থেকে বয়স্ক, সবাই পাচ্ছেন আন্তরিক পরিবেশে চিকিৎসাসেবা।

তার প্রতিশ্রুতি সরল ও দৃঢ়: ৩০০ টাকা ফিতে আজীবন রোগী দেখবেন। এই শহরে, এই যুগে, যখন বেসরকারি ডাক্তারদের ফি হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তখন এই প্রতিশ্রুতি একটি বিপ্লব।

সরকারি চাকরিতে থেকেও তিনি গ্রামে চলে এসেছিলেন। কারণ বাবার স্বপ্ন ছিল, ছেলে গ্রামের মানুষের সেবা করবে। দীর্ঘ চার দশক ধরে সেই স্বপ্ন পূরণ করে চলেছেন তিনি।

চিকিৎসা পেশার আয়, মানবকল্যাণের ব্যয়

কিন্তু ডা. ফারুকের পরিচয় শুধু চিকিৎসকে সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসা পেশা থেকে অর্জিত আয় এবং নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে সংগ্রহ করা অর্থের বড় অংশ ব্যয় করে চলেছেন মানবকল্যাণে। মসজিদ, মাদরাসা, হেফজখানা, পাঠাগার, চক্ষু চিকিৎসা শিবির। একের পর এক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন তিনি।

২০১৮ সালে নিজ গ্রাম পাতাকোটে একক অর্থায়নে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয় করে পুনর্নির্মাণ করেন “হাজী আব্দুর রশিদ জামে মসজিদ”। পূর্বে “হলুদ মসজিদ” নামে পরিচিত আধাপাকা পুরনো মসজিদটি ভেঙে নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মাণ করা হয় আধুনিক মসজিদ। জনশ্রুতি রয়েছে, এটিই মিরসরাইয়ের প্রথম আর্কিটেকচারাল মসজিড। এখন সেখানে পাঁচশো মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারেন।

একই মসজিদে ২০২০ সালে মা-বাবার নামে চালু করেন হিফজ মাদরাসা। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থাকা-খাওয়াসহ দশজন শিক্ষার্থীর হিফজ পড়ার ব্যবস্থা।

২০২১ সালে ফটিকছড়ির দাঁতমারা ইউনিয়নের বালুখালী গ্রামে মা-বাবার নামে নির্মাণ করেন দ্বিতল “(শহীদ) রওশন-জামান জামে মসজিদ”। দীর্ঘ ৬৫ বছর ধরে মাটির পাঞ্জেগানা মসজিদ যেখানে সর্বোচ্চ আট জন নামাজ পড়তে পারতেন, সেখানে এখন আড়াইশো মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারছেন। রমজানে এখানে নারীরা জামাতের সঙ্গে খতম তারাবির নামাজ আদায় করেন। ফটিকছড়ি উপজেলায় নারীদের মসজিদে নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে এটি দ্বিতীয় মসজিদ।

একই মসজিদে ২০২৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মুক্তিযুদ্ধে শহীদ একমাত্র বোনের নামে গড়ে তোলেন “শহীদ শাহীন আরা খানম স্মৃতি ইসলামী পাঠাগার”। আড়াইশোর বেশি ইসলামী বই নিয়ে এই পাঠাগার এলাকার তরুণদের ইসলামি শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

শিক্ষার আলো, জীবনের পথ

২০২৩ সালে নিজ গ্রাম মিরসরাইয়ের পাতাকোট এলাকায় মা-বাবার নামে প্রতিষ্ঠা করেন “(শহীদ) রওশন-জামান নূরানী মাদরাসা”। সামান্য বেতনে আশপাশের শিশুরা পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। পাঁচটি শ্রেণিতে ১১৫ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে, যার মধ্যে ৩০ জন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়ছে।

মাদরাসার প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ইলিয়াছ জানান, অধিকাংশ ব্যয় বহন করেন ডা. ফারুক নিজেই। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বোর্ড পরীক্ষায় এই মাদরাসার শিক্ষার্থীরা শতভাগ পাশ করেছে।

২০২৫ সালে ফটিকছড়ির দাঁতমারা ইউনিয়নের গ্রামপাড়ায় শ্বশুর-শাশুড়ির নামে চালু করেন “হাছিনা-কামাল হেফজখানা”। একসাথে ২৫ জন শিক্ষার্থী হেফজ পড়তে পারে। বর্তমানে ২৩ জন অধ্যয়নরত।

বয়স্কদের জন্য কুরআন শিক্ষা

২০২৫ সালের আগস্ট মাসে একটি অনন্য উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। হাজী আব্দুর রশিদ জামে মসজিদে বয়স্কদের জন্য সহীহ কুরআন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেন। ৩০ জন বয়স্ক ব্যক্তি বৃদ্ধ বয়সেও শুদ্ধভাবে কুরআন শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন।

নিজ বাড়িতে বয়স্ক নারীদের জন্যও কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। বর্তমানে ৩০ জন বয়স্ক মহিলা সেখানে কুরআন শিখছেন।

চোখে আলো জ্বালানোর প্রচেষ্টা

দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে নিজ হাসপাতাল ও বাড়িতে লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালের উদ্যোগে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করে আসছেন। কয়েক হাজার মানুষ এই সেবা গ্রহণ করেছেন। তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে অসংখ্য মানুষ বিনামূল্যে চক্ষু অপারেশনের সুযোগও পেয়েছেন।

যে সংখ্যাগুলো বলে দেয় তাঁর কাজের মাপ

ডা. ফারুকের ব্যক্তিগত অর্থায়নে ইতোমধ্যে ৩১ জন শিক্ষার্থী হেফজ সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে আরও ১৩ জন হেফজ পড়ছেন।

মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি জিয়াউল হক বলেন, “আমরা গ্রামবাসী আজীবন ডা. এস. এ. ফারুকের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব। আমাদের গ্রাম ছিল অত্যন্ত অবহেলিত। আগে জুমার নামাজ আদায়ের জন্য দূর-দূরান্তে যেতে হতো। তিনি প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে মসজিদ নির্মাণ করে দিয়েছেন। আমরা একসময় তাকে শিশু ডাক্তার হিসেবে চিনতাম, এখন তিনি মানবদরদি মানুষ হিসেবেও পরিচিত।”

মসজিদের মোতাওয়াল্লী আফজল আহমেদ বলেন, “মাটির টিনশেড মসজিদ দ্বিতীয় তলা ভবনে রূপ নেবে তা আমরা কখনো কল্পনাও করিনি। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে ডা. এস. এ. ফারুকের ব্যক্তিগত অর্থায়নে এই মসজিদ নির্মিত হয়েছে।”

বাবার স্বপ্ন, নিজের ব্রত

ডা. এস. এ. ফারুক বলেন, “আমার স্কুল জীবনে আমার বাবা সবসময় বলতেন আমাকে ডাক্তারি পড়াবেন। আল্লাহর রহমতে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। কিন্তু আমার বাবা সেটি দেখে যেতে পারেননি। বাবার খুব ইচ্ছে ছিল আমি ডাক্তার হয়ে গ্রামে গিয়ে মানুষের সেবা করব। আমি সেই কথাগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করছি। সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থাতেই গ্রামের মানুষের সেবা করার উদ্দেশ্যে গ্রামে চলে এসেছি। আমি চাই মানুষ স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা সেবা পাক। পাশাপাশি সমাজের কল্যাণে কাজ করারও চেষ্টা করছি। আমার ইচ্ছে, আমার অবর্তমানেও যেন এই প্রতিষ্ঠানগুলো চলমান থাকে।”

১৯৭১ সালের ৬ এপ্রিল যে শিশু তার পুরো পরিবার হারিয়েছিল, আজ সেই মানুষটি শত শত পরিবারের আশ্রয়। যে ক্ষত কখনো শুকায়নি, সেই ক্ষত থেকেই জন্ম নিয়েছে অসীম মানবপ্রেম।

ডা. এস. এ. ফারুক শুধু একজন চিকিৎসক নন। তিনি একটি জীবন্ত উদাহরণ, যে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি থেকেও জন্ম নিতে পারে সামাজিক দায়বদ্ধতা। যে ক্ষতির স্মৃতি বোঝা না হয়ে হতে পারে অন্যের কল্যাণের শক্তি।

বাবার শেষ স্বপ্ন এখন হাজারো মানুষের বাস্তবতা।