সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

জঙ্গল সলিমপুর: সড়ক নির্মাণেই কি ফিরবে শান্তি?

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২৬ মে ২০২৬ | ১২:১৬ অপরাহ্ন


চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর। নামটি শুনলেই এলাকাবাসীর মুখে ভয়ের ছাপ। প্রায় তিন হাজার একশো একর বিস্তৃত এই এলাকা দীর্ঘদিন ধরে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। নব্বইয়ের দশক থেকে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রবেশ ছিল প্রায় অসম্ভব।

এখন সেই এলাকায় নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে তিনটি সংযোগ সড়ক পাকা করার উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। ১৬ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ চেয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সড়ক পাকা হলেই কি শান্তি ফিরবে এই অঞ্চলে?

যে এলাকায় আইন পৌঁছাতে পারত না

জঙ্গল সলিমপুরের ইতিহাস ভয়ংকর। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে এলাকাটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীরা নারী ও শিশুদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করত। ফলে প্রশাসনের হাত ছিল অনেকটাই বাঁধা।

দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল। পাকা সড়ক নেই, শুধু আঁকাবাঁকা মাটির রাস্তা। বর্ষাকালে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই দুর্গমতাই ছিল সন্ত্রাসীদের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ।

একজন কর্মকর্তার মৃত্যু, তারপর বড় অভিযান

গত ১৯ জানুয়ারি। অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে গেলে র‍্যাব সদস্যদের ওপর হামলা ও গুলি চালানো হয়। সেদিন শহীদ হন র‍্যাবের উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। আহত হন আরও তিন সদস্য।

এই ঘটনার পর প্রশাসন বুঝতে পারে, জঙ্গল সলিমপুর আর সহ্য করা যায় না। ৯ মার্চ ভোরে ঘটল ইতিহাস। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও জেলা প্রশাসনের প্রায় চার হাজার সদস্যের সমন্বয়ে বিশাল যৌথ অভিযান চালানো হয়। দীর্ঘ তিন দশক পর এলাকাটি দখলমুক্ত করা হয়। স্থায়ী নিরাপত্তার জন্য দুটি যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।

মনে হচ্ছিল, জঙ্গল সলিমপুরে শান্তি ফিরছে।

কিন্তু প্রতিরোধ থামেনি

কিন্তু সন্ত্রাসীরা এত সহজে হাল ছাড়েনি। সম্প্রতি গভীর রাতে আলীনগর এলাকায় র‍্যাব ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে গুলি ছুড়েছে দুর্বৃত্তরা। এবং আরও ভয়ংকর: বুলডোজার দিয়ে ক্যাম্পের দেয়াল ও বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে।

বুলডোজার? হ্যাঁ, বুলডোজার। এটি প্রমাণ করে এই সন্ত্রাসীদের সংগঠন কতটা শক্তিশালী। তারা শুধু অস্ত্র নয়, ভারী যন্ত্রপাতিও ব্যবহার করতে পারে।

একই সঙ্গে অভিযানে বাধা দিতে অন্তত তিনটি স্থানে রাস্তা কেটে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বার্তাটা স্পষ্ট: আমরা এখানে আছি, আমরা প্রতিরোধ করব।

যে কারণে সড়ক এখন জরুরি

এই পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসন বুঝতে পেরেছে, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থাই এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা। নিরাপত্তা ক্যাম্পে খাবার, পানি ও অন্যান্য সরঞ্জাম সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত শক্তি পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।

গত ২ এপ্রিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে তাই ১৬ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক পাকা করার জন্য। এই কাজ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডকে দিয়ে অর্পিত ক্রয়কাজ (ডিপিএম) পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।

কোন সড়কগুলো হবে

প্রস্তাবিত তিনটি সড়কের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় সোয়া ছয় কিলোমিটার।

সবচেয়ে বড় প্রকল্প: বায়েজিদ লিংক রোড থেকে কালা পানিয়া বেতুয়া সড়ক হয়ে হাটহাজারী বাজার লিংক সড়ক পর্যন্ত। ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় আট কোটি টাকা।

দ্বিতীয় প্রকল্প: জলিল টেক্সটাইল থেকে আলীনগর প্রাইমারি অ্যান্ড হাইস্কুল সড়ক। ব্যয় প্রায় পাঁচ কোটি টাকা।

তৃতীয় প্রকল্প: ছিন্নমূল বিদ্যুৎ অফিস থেকে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট এম আর চৌধুরী ফায়ারিং রেঞ্জ সড়ক। ব্যয় প্রায় তিন কোটি টাকা।

প্রশাসনের আশা

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলছেন, সড়কগুলো পাকা হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সহজ হবে, প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়বে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের যোগাযোগব্যবস্থারও উন্নতি ঘটবে।

জেলা প্রশাসন জানাচ্ছে, সড়ক উন্নয়ন হলে প্রশাসনিক কার্যক্রম ও জনসাধারণের চলাচল স্বাভাবিক হবে। সন্ত্রাসীরা আর আগের মতো দুর্গম এলাকায় আশ্রয় নিতে পারবে না।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়

সড়ক পাকা হলে নিশ্চয়ই যোগাযোগ সহজ হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলাচল সহজ হবে। কিন্তু শুধু সড়ক কি যথেষ্ট?

যে সন্ত্রাসীরা র‍্যাব ক্যাম্পে বুলডোজার নিয়ে হামলা করতে পারে, তারা পাকা সড়কও তো ভেঙে ফেলতে পারে। যারা তিন জায়গায় রাস্তা কেটে দিতে পারে, তারা পাকা সড়কেও মাইন পুঁতে রাখতে পারে।

জঙ্গল সলিমপুরে শান্তি ফেরাতে দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। শুধু সড়ক নয়, দরকার স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দরকার স্থানীয় বাসিন্দাদের আস্থা অর্জন। দরকার সন্ত্রাসীদের রসদ ও আশ্রয় বন্ধ করা।

সড়ক হতে পারে একটি শুরু। কিন্তু শেষ নয়।

তিন দশক ধরে যে এলাকা সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেখানে শান্তি ফেরাতে সময় লাগবে। সড়ক পাকা হলেই কাজ শেষ নয়। এটি একটি যুদ্ধ, যে যুদ্ধে জিততে হলে শুধু সামরিক শক্তি নয়, প্রয়োজন সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নও।

চট্টগ্রামের মানুষ দেখছে। তারা দেখতে চায়, এবারের উদ্যোগ কি আগের মতোই ব্যর্থ হবে, নাকি সত্যিই শান্তি ফিরবে তাদের এলাকায়।