সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

চট্টগ্রামে জিয়া হত্যার নেপথ্যে কে: সীমিত বিদ্রোহ নাকি বড় ষড়যন্ত্র?

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৩০ মে ২০২৬ | ১০:৩৬ পূর্বাহ্ন


১৯৮১ সালের ৩০ মে। ভোর চারটা।

চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিল মেশিনগানের গুলির শব্দ। সেই শব্দ শুধু একটি ভবনের দেয়াল ভেদ করেনি—ভেদ করেছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার ইতিহাস।

সার্কিট হাউসে সেই রাতে ছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। আগের দিন এসেছিলেন দলীয় বিরোধ মেটাতে। কিন্তু ভোর হওয়ার আগেই সেই সফর পরিণত হলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অধ্যায়ে।

সেই থেকে ৪৫ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সেই রাতের পুরো সত্য আজও অজানা।

ডিসি হিলে ঘুম ভাঙে যেভাবে

সার্কিট হাউস থেকে মাইলখানেক দূরে ডিসি হিলে তখন ঘুমাচ্ছিলেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী। ভোরের দিকে গোলাগুলির শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। প্রহরী এসে জানাল, শব্দ আসছে সার্কিট হাউসের দিক থেকে।

কিছুক্ষণ পর ফোন এল। সার্কিট হাউস-সংলগ্ন সরকারি গ্যারেজ থেকে সহকারী প্রটোকল অফিসার মোশতাক জানালেন, ভোর চারটার দিকে সেনাবাহিনীর কয়েকটি গাড়ি গুলি করতে করতে সার্কিট হাউসে ঢুকে পড়েছে। তিনি নিজে ডাইনিং রুমের টেবিলের নিচে লুকিয়ে ছিলেন। ভারী বুটের শব্দ শুনেছেন, সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার শব্দ শুনেছেন, আর শুনেছেন আরও গুলির শব্দ।

তারপর বিভাগীয় কমিশনার সাইফুদ্দিন ফোন করলেন। জিয়াউদ্দিনকে জানালেন মাত্র একটি বাক্যে: রাষ্ট্রপতি জিয়া নিহত হয়েছেন।

সাদা কাপড়ে ঢাকা রাষ্ট্রপতি

জিয়াউদ্দিন এবং বিভাগীয় কমিশনার একসাথে গেলেন সার্কিট হাউসে। প্রধান ফটক খোলা। কার্যকর কোনো প্রহরা নেই। সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নেই।

ওপরতলায় রাষ্ট্রপতির কক্ষের দরজার কাছে পড়ে আছে সাদা কাপড়ে ঢাকা একটি মরদেহ।

জিয়াউর রহমান। রাষ্ট্রপতি, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার।

এই দৃশ্যের বর্ণনা পরে জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী তুলে ধরেছেন তাঁর বই ‘দুই জেনারেলের হত্যাকাণ্ড: ১৯৮১-র ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান’-এ। সেই বর্ণনা শুধু একজন প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতি নয়—এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার ইতিহাসের এক নির্মম দলিল।

হঠাৎ সফর, অস্বাভাবিক অনুপস্থিতি

জিয়াউর রহমানের চট্টগ্রাম সফর ছিল হঠাৎ নির্ধারিত। তিনি প্রায় প্রতি মাসেই চট্টগ্রাম আসতেন, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী দমনে সেনা ক্যাম্প পরিদর্শনে। কিন্তু এই সফরটি ছিল ভিন্ন। মাত্র দুই সপ্তাহ আগে কক্সবাজারে সেনা মহড়া দেখে গেছেন। এত তাড়াতাড়ি আবার আসার কোনো ইঙ্গিত ছিল না।

খবর এল: চট্টগ্রাম বিএনপিতে তীব্র অভ্যন্তরীণ বিরোধ। দলের নেতৃত্ব দুই ভাগে বিভক্ত। এক পক্ষে উপপ্রধানমন্ত্রী জামালউদ্দীন আহমেদ, অন্য পক্ষে ডেপুটি স্পিকার সুলতান আহমেদ চৌধুরী। বিরোধ এমন পর্যায়ে গেছে যে কর্মীরা সংঘর্ষে জড়াচ্ছেন, শহরের আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হচ্ছে, পুলিশও নাজেহাল।

জিয়া এলেন, ১৯৮১ সালের ২৯ মে সকালে। বিমানবন্দরে অভ্যর্থনায় ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশ কমিশনার, নৌ ও বিমানবাহিনীর স্থানীয় প্রধান, ডেপুটি স্পিকার ও বিএনপির জেলা সভাপতি।

কিন্তু ছিলেন না একজন। ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুর। তাঁর জায়গায় ছিলেন ব্রিগেডিয়ার আজিজ।

মঞ্জুরের অনুপস্থিতি তখনই অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল।

চন্দনপুরা থেকে মধ্যরাতের বৈঠক

সেদিন বিমানবন্দর থেকে জিয়া গেলেন সার্কিট হাউসে। চন্দনপুরা মসজিদে জুমার নামাজ পড়লেন। ফিরে এসে বিকেল তিনটায় শুরু হলো বৈঠক—বিএনপির স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে। সন্ধ্যা পেরিয়ে, রাত পেরিয়ে প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত চলল সেই বৈঠক।

সেটিই ছিল চট্টগ্রামে জিয়াউর রহমানের শেষ রাজনৈতিক বৈঠক।

ঢাকায় সাংবিধানিক লড়াই

সকাল হতে না হতেই চট্টগ্রাম বেতার থেকে ভেসে এল ঘোষণা। মঞ্জুরের বরাতে জানানো হলো জিয়ার নিহত হওয়ার খবর। মঞ্জুর নিজেকে পরিচয় দিলেন ‘বিপ্লবী পরিষদের’ মুখপাত্র হিসেবে।

চট্টগ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। সান্ধ্য আইন জারি হলো। ঢাকার সাথে টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। সড়ক ও আকাশপথ বন্ধ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল দেশের কেন্দ্রীয় শাসন থেকে।

ঢাকায় তখন দ্রুত ঘুরছে সাংবিধানিক চাকা। উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলেন। সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদ সাত্তার সরকারের প্রতি আনুগত্য জানালেন। ৩০ মে দুপুরে রেডিও-টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন বিচারপতি সাত্তার। জরুরি অবস্থা জারি হলো। জাতীয় শোক ঘোষণা হলো।

পাহাড়ে লুকানো মরদেহ

এর মধ্যে চলছিল আরেকটি গল্প—জিয়াউর রহমানের মরদেহ কোথায়?

সকাল আটটা থেকে নয়টার মধ্যে সেনাবাহিনীর একটি দল সার্কিট হাউসে এসে জিয়াউর রহমানসহ অন্তত তিনজনের মরদেহ গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। পরে জানা যায়, রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়ি এলাকায় গোপনে দাফন করা হয়েছে।

একটি কবরে। তিনজনকে। যেখানে এক স্থানীয় মৌলভি লাশ কার, তা না জেনেই সহায়তা করেছিলেন।

তৎকালীন মেজর রেজাউল করিম পরে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, মরদেহ পাহাড়ে দাফনের দায়িত্ব প্রথমে তাঁকে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। তিনি অনীহা জানালে মেজর শওকত আলীকে দেওয়া হয়। একই কবরে ছিলেন কর্নেল এহসান ও ক্যাপ্টেন হাফিজও।

পরে রাঙ্গুনিয়া থানার পুলিশের তথ্যে কবর খুঁড়ে উদ্ধার করা হলো জিয়ার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ।

লালদীঘির জানাজা: দুই দিনের বিপরীত ছবি

লালদীঘি ময়দানে বিএনপি আয়োজন করল গায়েবানা জানাজা। বিকেল চারটায় সেখানে গেলেন জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিন। দেখলেন বিপুল মানুষের জমায়েত। আরও আসছে।

দৃশ্যটি তাঁকে অবাক করেছিল। কারণ আগের দুটো দিন চট্টগ্রামের রাস্তা ছিল জনশূন্য। বিএনপির নেতা-কর্মীরা গা ঢাকা দিয়েছিলেন। বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট হতেই তাঁরা ফিরে এসেছেন।

জিয়াউদ্দিন পরে লিখেছেন: সেদিন লক্ষ মানুষের জমায়েত দেখে তাঁর মনে পড়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কথা। পার্থক্য শুধু একটি—সেই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়নি। এটি হয়েছে।

মঞ্জুরের শেষ রাত, শেষ দেখা

৩১ মে রাতে মেজর জেনারেল মঞ্জুর সেনানিবাস ছাড়লেন। সাথে স্ত্রী, চার সন্তান, কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা।

হাটহাজারী হয়ে খাগড়াছড়ির দিকে যাওয়ার পথে পাহাড়ি এলাকায় সামনে গোলাগুলির শব্দ। গাড়ি ঘোরানোর নির্দেশ দিলেন মঞ্জুর। সেই মুহূর্তে গাড়ি বিকল।

তারপর পায়ে হাঁটা, চা-বাগানের ভেতর দিয়ে। একজন কুলির বাড়িতে খাবারের জন্য থামা—কারণ সন্তানরা ক্ষুধার্ত।

সেখানেই কুকুরের ঘেউ ঘেউ। দূরে খাকি পোশাক। পুলিশ।

মঞ্জুর বললেন, আমি সারেন্ডার করব।

জঙ্গলের ভেতরে দাঁড়িয়ে তিনি আত্মসমর্পণ করলেন। পরিবারসহ নেওয়া হলো হাটহাজারী থানায়।

থানার বাইরে তখন হাজারো মানুষ। কিছুক্ষণ পর এল সশস্ত্র সেনা। দাবি: মঞ্জুর সামরিক কর্মকর্তা, তাঁকে সেনার হাতে দিতে হবে। মঞ্জুর রাজি নন। তিনি পুলিশ হেফাজতে জেলে যেতে চান।

ঢাকায় যোগাযোগ হলো। বিচারপতি সাত্তার, সেনাপ্রধান এরশাদের সাথে কথা বললেন। শেষ সিদ্ধান্ত: মঞ্জুরকে সেনার হাতে দিয়ে দাও।

সেনারা থানাহাজত থেকে তাঁকে বের করে আনল। হাত বাঁধা অবস্থায় তুলল জিপে। স্ত্রী-সন্তানদের তোলা হলো আলাদা জিপে।

সেটিই ছিল পরিবারের সাথে মঞ্জুরের শেষ দেখা।

চট্টগ্রাম সেনানিবাসে পৌঁছানোর পরপরই গুলি করে হত্যা করা হলো তাঁকে।

দ্রুত বিচার, বন্ধ ফাইল

জিয়া হত্যার পর সামরিক আদালতে বিচার হলো দ্রুত। ১৩ জন সেনা কর্মকর্তার ফাঁসি হলো। কিন্তু প্রশ্ন থামেনি।

হত্যার পরিকল্পনা কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল? মঞ্জুরের প্রকৃত ভূমিকা কী ছিল? সার্কিট হাউসের নিরাপত্তা এত সহজে ভেঙে পড়ল কীভাবে? বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন কেন আজও প্রকাশিত হলো না?

জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী তাঁর বইয়ে বলেছেন, দুটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল। তাঁর বক্তব্যও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিচার বিভাগীয় কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশই হয়নি।

মঞ্জুরের ভাই ১৯৯৫ সালে মামলা করেছিলেন। বহু বছর চলেছে মামলা। কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘতা কোনো চূড়ান্ত উত্তর দিতে পারেনি।

৪৫ বছর পর যা স্পষ্ট, যা এখনো অন্ধকার

স্পষ্ট যা: ৩০ মে ভোরে জিয়াউর রহমান নিহত হয়েছিলেন। বিদ্রোহ দ্রুত ব্যর্থ হয়েছিল। মঞ্জুর আত্মসমর্পণের পর সেনাহেফাজতে নিহত হয়েছিলেন। ১৩ জনের ফাঁসি হয়েছিল। এরশাদ এক বছরের মধ্যে ক্ষমতা নিয়েছিলেন।

অস্পষ্ট যা: কে পরিকল্পনা করেছিল? মঞ্জুর কতটুকু জানতেন? কে চেয়েছিল তাঁকে বিচারের আগেই নিঃশব্দ করে দিতে? বিচার বিভাগীয় প্রতিবেদনে কী ছিল, যা প্রকাশ করা যায়নি?

অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর ‘বাংলাদেশ: আ লিগ্যাসি অব ব্লাড’-এ এই হত্যাকে শুধু সীমিত সামরিক বিদ্রোহ হিসেবে দেখেননি। তাঁর বিশ্লেষণে ছিল সেনাবাহিনীর ভেতরের জমে থাকা অসন্তোষ, মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তানফেরত কর্মকর্তাদের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব, পদায়ন-পদোন্নতি নিয়ে ক্ষোভ এবং জিয়ার ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসনের বিরুদ্ধে জমে ওঠা ক্রোধ।

কিন্তু জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর মূল্যায়ন ভিন্ন। তাঁর মতে মঞ্জুরের মূল ক্ষোভ ছিল এরশাদের প্রতি, জিয়ার প্রতি নয়। জিয়া হত্যায় মঞ্জুর সরাসরি জড়িত ছিলেন কিনা সে বিষয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন। এই ভিন্নতাই ঘটনাটিকে করে তোলে আরও জটিল, আরও রহস্যময়।

ইতিহাসের অসমাপ্ত পৃষ্ঠা

চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সেই রক্তাক্ত ভোরে একজন রাষ্ট্রপতি নিহত হয়েছিলেন। কিন্তু সেদিনের সাথে সাথে উঠে এসেছিল রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী ও ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে অনেক অস্বস্তিকর প্রশ্ন।

জিয়া হত্যাকাণ্ড শুধু একজন মানুষের হত্যা নয়। এটি ১৯৭৫ সালের পর শুরু হওয়া রাষ্ট্রক্ষমতার ধারাবাহিক অস্থিরতার আরেক রক্তাক্ত বাঁক। এখানে মিশে আছে সেনাবাহিনীর ভেতরের আনুগত্য-অসন্তোষের দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক বৈধতার সংকট, দ্রুত বিচার বনাম সত্য অনুসন্ধানের প্রশ্ন এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার ভেঙে পড়ার ভয়াবহ দৃষ্টান্ত।

৪৫ বছর পরও সেই ইতিহাসের ফাইল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ইতিহাসের কয়েকটি পাতা এখনো সাদা—যেখানে লেখা হয়নি শেষ সত্য।

তথ্যসূত্র: জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর ‘দুই জেনারেলের হত্যাকাণ্ড: ১৯৮১-র ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান’, অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ‘বাংলাদেশ: আ লিগ্যাসি অব ব্লাড’, প্রথম আলোর ২০২৪ ও ২০২৫ সালের প্রতিবেদন ও সাক্ষাৎকার এবং বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন।