সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

‘জীবনেও আর চামড়া ব্যবসা করব না’

মিরসরাইয়ে চামড়া কিনে বিপাকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা
এম মাঈন উদ্দিন | প্রকাশিতঃ ৩০ মে ২০২৬ | ১১:৩৭ পূর্বাহ্ন


‘যে টাকা দিয়ে চামড়া কিনেছি, সেই টাকাও উঠছে না। লাভ তো দূরের কথা। এখনো রাস্তার পাশে পড়ে রয়েছে, কী করব বুঝতে পারছি না। এমন হবে জানলে চামড়া কিনতাম না। কান ধরেছি, জীবনেও আর চামড়া ব্যবসা করব না।’

আক্ষেপ নিয়ে ও হতাশ হয়ে কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী আকবর বাদশা।

আকবর বাদশা বলেন, ফেনীর বড় এক ব্যবসায়ী ৩০০ টাকা করে রেট দিয়েছিলেন, তাই আকবর বাদশা ১৫০ টাকা ও ২০০ টাকা দরে ৫০০ চামড়া ক্রয় করেছেন। বাড়ি থেকে সংগ্রহ করে বাজারে নিয়ে আসা, লবণ মাখা এবং শ্রমিকদের মজুরিসহ প্রতি পিস চামড়ায় আকবর বাদশার ৩০০ টাকা খরচ পড়ে গেছে। আকবর বাদশা আরও জানান, এখন ওই বড় ব্যবসায়ী মোবাইলও ধরছেন না। প্রায় ৫০০ পিস চামড়া কিনে আকবর বাদশা এখন কী করবেন, তা বুঝতে পারছেন না।

আরেক ব্যবসায়ী মোশারফ হোসেন বলেন, ঈদের সারাদিন ঘুরে ঘুরে চামড়া সংগ্রহ করে বিকেলে বাজারে তোলার পর প্রথম ৫-৬ ঘণ্টা কেউ মোশারফ হোসেনকে জিজ্ঞেস করতে আসেনি। পরে রাতে মোশারফ হোসেনের ছোট ভাই গড়ে ২২০ টাকা করে লোকসানে সব চামড়া বিক্রি করে দিয়ে কোনো রকম রেহাই পেয়েছেন বলে মোশারফ হোসেন জানান।

শুধু আকবর বাদশা বা মোশারফ হোসেন নন, এভাবে চামড়া কিনে লোকসানে পড়েছেন মিরসরাই উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার শত শত মৌসুমি ব্যবসায়ী।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন বাজারে, বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে চামড়ার স্তূপ পড়ে রয়েছে। এসব চামড়া থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আশপাশের ব্যবসায়ীরা দোকানে বসতে পারছেন না। পথচারীদের হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। অনেক পথচারীকে নাক ধরে হাঁটতে দেখা গেছে।

সরকার নির্ধারিত দাম ঘোষণা করলেও বাস্তবে সেই দামের অর্ধেকেও চামড়া বিক্রি করা যাচ্ছে না বলে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন। এতে লোকসানের শঙ্কায় হতাশ হয়ে এক আড়ত থেকে আরেক আড়তে ঘুরছেন এসব ব্যবসায়ীরা।

বারইয়ারহাট এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আকতার হোসেন বলেন, এবার কোরবানিদাতারা তাদের পশুর চামড়ার উপযুক্ত দাম পাননি। অপরদিকে লোকসান গুনতে হয়েছে গ্রাম থেকে সংগ্রহকারী খুচরা ব্যবসায়ীদের। মোহাম্মদ আকতার হোসেনের মতে, বরাবরই লাভবান হয় সিন্ডিকেট। বারইয়ারহাট রেললাইনের পাশে সড়কের ওপর এভাবেই ফেলে চলে যাওয়া কোরবানির পশুর চামড়া দীর্ঘ সময় পড়ে থাকার ফলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। যার কারণে চলাচলকারী মানুষের কষ্ট হচ্ছে বলে মোহাম্মদ আকতার হোসেন উল্লেখ করেন।

ডাকঘর এলাকার আবু দাউদ বলেন, তিনি দুই শতাধিক চামড়া কিনেছিলেন, পরে আবু দাউদ লোকসানে পানির দরে সেসব বিক্রি করেছেন। চামড়া সংগ্রহ করা শ্রমিকের মজুরিও আবু দাউদের ওঠেনি।

উপজেলার বড়তাকিয়া বাজারে সড়কের পাশে সারি করে রাখা হয়েছে শত শত চামড়া। অনেক ব্যবসায়ী সম্ভাব্য ক্রেতার অপেক্ষায় বসে থাকলেও কাঙ্ক্ষিত দর পাচ্ছেন না। তাদের অভিযোগ, প্রতিবছরই সরকার দাম নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায় না।

ইতিমধ্যে প্রশাসন থেকে অবিক্রীত চামড়ার জন্য বিনামূল্যে লবণ বিতরণ করার ঘোষণা থাকলেও সাধারণ মানুষ তা সঠিকভাবে জানতেন না। অবিক্রীত চামড়ায় লবণ দিয়ে বিক্রির কথা বলা হয়ে থাকলেও ব্যবসায়ীরা তা করেননি। ফলে ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার সাথে সাথে তাতে পচন ধরে পুরো এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।

এ ব্যাপারে মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তার জানান, সরকার চামড়া বিক্রির দাম প্রকাশ করেছে। কীভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, তাও সরকার বলে দিয়েছে। বিনামূল্যে লবণ দেওয়ার ব্যবস্থাও সরকার করেছে বলে সোমাইয়া আক্তার উল্লেখ করেন। সোমাইয়া আক্তার আরও জানান, প্রত্যেক এলাকায় চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং ফেলে যাওয়া ও পচনশীল চামড়া পরিষ্কার করার জন্য মিরসরাই পৌরসভা কাজ করে যাচ্ছে।