সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

ছাড় দিয়ে নবায়ন করেও কেন কমছে না খেলাপি ঋণ?

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৩ জুন ২০২৬ | ৯:৩১ পূর্বাহ্ন


মার্চ ২০২৬। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের হিসাবের খাতায় একটি সংখ্যা লেখা হলো, যা দেখে শিউরে উঠতে হয়।

পাঁচ লাখ আটাশি হাজার সাতশো চার কোটি টাকা।

এই বিশাল অঙ্কটি কোনো বিনিয়োগ নয়, কোনো সম্পদ নয়। এটি খেলাপি ঋণ—যে টাকা ব্যাংকে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ফেরত আসেনি।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বলে, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ তিন শতাংশের বেশি হলেই তা বিপজ্জনক। বাংলাদেশে এই হার এখন বত্রিশ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রতি একশো টাকা ঋণের বিপরীতে বত্রিশ টাকাই ফেরত আসছে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মঙ্গলবার এই প্রতিবেদন অনুমোদন করেছেন। সংখ্যাগুলো যা বলছে, তা কেবল অর্থনীতির সমস্যা নয়—এটি রাষ্ট্রের আর্থিক ভবিষ্যতের জন্য একটি বিপদ সংকেত।

তিন মাসে বাড়ল একত্রিশ হাজার কোটি

গত ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল পাঁচ লাখ সাতান্ন হাজার দুইশো সতেরো কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে মার্চে এসে তা বেড়ে দাঁড়াল পাঁচ লাখ আটাশি হাজার সাতশো চার কোটি টাকায়।

তিন মাসে বৃদ্ধি: একত্রিশ হাজার চারশো সাতাশি কোটি টাকা।

এই অঙ্কটি বুঝতে সহজ করে বললে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিনশো পঞ্চাশ কোটি টাকা নতুন করে খেলাপি হয়েছে।

ডিসেম্বরে সাময়িক স্বস্তি এসেছিল। তার আগে সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ ছয় লাখ চৌচল্লিশ হাজার পাঁচশো পনেরো কোটি টাকায় পৌঁছে গিয়েছিল। তখন বড় ছাড় দিয়ে ঋণ নবায়নের মাধ্যমে ডিসেম্বরে সংখ্যাটি কমানো হয়েছিল সাতাশি হাজার কোটি টাকা।

কিন্তু সেই কমানো ছিল সাময়িক। ওষুধ নয়, ছিল ব্যথানাশক। মূল রোগ থেকেই গেছে। মার্চেই আবার ওপরে উঠে গেল সংখ্যাটি।

যে সংখ্যাগুলো দেখা যাচ্ছে না

সরকারি হিসাবে পাঁচ লাখ আটাশি হাজার কোটি টাকা খেলাপি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনের বাইরে রয়েছে আরও বিশাল অংক। আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে খেলাপি ঋণ নিয়মিত দেখানো হচ্ছে। খেলাপিযোগ্য কিন্তু এখনো খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়নি এমন ঋণ আছে। বিশেষ ছাড়ে নবায়ন করা ঋণ আছে। আর আছে অবলোপন করা পঞ্চান্ন হাজার কোটি টাকা—যা হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে।

সব মিলিয়ে প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ কোটি টাকা বর্তমান হিসাবের বাইরে। প্রকৃত খেলাপি ঋণ যোগ করলে পরিস্থিতি আরও গভীর হয়ে যায়।

খেলাপির আগের ধাপেও বিপদ

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, খেলাপি হওয়ার ঠিক আগের ধাপে—যাকে বলা হয় ‘স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট’—সেখানে পড়ে আছে আরও এক লাখ বত্রিশ হাজার একশো বিশ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরে এই অঙ্ক ছিল এক লাখ তিন হাজার কোটি টাকা।

মাত্র তিন মাসে এই স্তরেও বৃদ্ধি হয়েছে আটাশ হাজার সাতশো ছেচল্লিশ কোটি টাকা।

এই ঋণগুলো এখন যদি পরিশোধ না হয়, এগুলো পরিণত হবে নতুন খেলাপিতে। ফলে জুন প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ আরও বাড়ার আশঙ্কা এখন প্রায় নিশ্চিত।

প্রভিশন ঘাটতি: দুই লাখ কোটির সংকট

খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংকগুলোকে তার বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হয়। এটি একটি নিরাপত্তা তহবিল—যেন ঋণ না আসলেও ব্যাংকের মূল কার্যক্রম চলতে পারে।

মার্চে ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ ছিল চার লাখ একষট্টি হাজার সাতশো চোদ্দ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে রাখা আছে মাত্র দুই লাখ ছাপান্ন হাজার কোটি টাকা।

ঘাটতি: দুই লাখ পাঁচ হাজার ছয়শো পঁয়ষট্টি কোটি টাকা।

ডিসেম্বরে এই ঘাটতি ছিল এক লাখ একানব্বই হাজার চারশো একচল্লিশ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসে ঘাটতি বেড়েছে আরও চোদ্দ হাজার কোটি টাকা।

সরকারি ব্যাংক সবচেয়ে খারাপ অবস্থায়

ব্যাংকভেদে খেলাপির চিত্র আলাদা হলেও সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সংকটজনক।

সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে খেলাপির হার সবচেয়ে বেশি—পঁয়তাল্লিশ দশমিক পঁচাশি শতাংশ। এই ব্যাংকগুলোতে মোট খেলাপি এক লাখ পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা।

সরকারি বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে খেলাপির হার চল্লিশ দশমিক বাহাত্তর শতাংশ। মোট খেলাপি ঊনিশ হাজার কোটি টাকা।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপির হার তিরিশ দশমিক এক শতাংশ। মোট চার লাখ ষোলো হাজার কোটি টাকা।

শুধু বিদেশি ব্যাংকগুলোতে খেলাপির হার আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি।

কেন বাড়ছে খেলাপি ঋণ

বিশেষজ্ঞরা তিনটি কারণ চিহ্নিত করছেন।

প্রথমত, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া ঋণ এবং লুটপাটের মাধ্যমে সৃষ্ট খেলাপি ঋণ বিশেষ ছাড়ে নবায়ন করা হয়েছিল। সেই নবায়ন করা ঋণগুলোই এখন আবার খেলাপি হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ পরিশোধ না হওয়া। ব্যবসায়িক মন্দা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপে অনেক উদ্যোক্তার ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে গেছে।

তৃতীয়ত, দেশীয় ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ব্যবসায়িক মন্দা। অনেক সৎ উদ্যোক্তাও এখন ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না।

সংকটের শৃঙ্খল

খেলাপি ঋণ বাড়লে কী হয়? শুধু ব্যাংকের ক্ষতি নয়—এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র অর্থনীতিতে।

ব্যাংকের তারল্য আটকে যায়। নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে। ঋণের সুদের হার কমানো যায় না, কারণ ব্যাংককে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সুদ বেশি রাখতে হয়। তাতে ব্যবসার খরচ বাড়ে। নতুন বিনিয়োগ আসে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না।

একটি পাগলা ঘোড়া যেমন থামে না, একবার শুরু হলে এই চক্রও থামে না সহজে।

প্রশ্ন একটাই

বড় ছাড় দিয়ে ঋণ নবায়ন করেও খেলাপি ঋণ কমানো যাচ্ছে না। এই পদ্ধতিতে সাময়িক স্বস্তি আসে, কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান হয় না। বরং দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতি আরও বাড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বিশেষ ঋণ পুনঃতফসিল নীতির কারণে ডিসেম্বরের পর মার্চ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে আসবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে।

তিনি জানান, বিশেষ নীতির আওতায় মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে অনেক ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে এসব ঋণের ওপর ১০ শতাংশের বেশি হারে সুদ আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নীতি-সহায়তা পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড থাকায় এ সময়ে মূল অর্থ আদায়ের সুযোগও ছিল না। ফলে সুদ সংযোজনের কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে।

খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন বলেন, সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দা, প্রবৃদ্ধির ধীরগতি ও উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব ঋণ পরিস্থিতির ওপর পড়েছে।

তিনি বলেন, নীতি-সহায়তার সুযোগ থাকলেও সব গ্রাহক তা নিতে পারেননি। কারণ, নীতি-সহায়তা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট অনেক ঋণগ্রহীতার পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। ফলে সহায়তার আওতায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল—এমন একটি বড় অংশের গ্রাহক শেষ পর্যন্ত এ সুবিধা নিতে পারেননি।

তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন ব্যাংকের বহিঃনিরীক্ষা (এক্সটার্নাল অডিট) সম্পন্ন হওয়ার পর নিরীক্ষকরা সব ক্ষেত্রে ছাড় দিতে রাজি হননি। অনেক ক্ষেত্রে ঋণকে শ্রেণিকরণ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি-সহায়তার সুবিধা পেলেও অন্য অনেক ঋণকে নিয়ম অনুযায়ী শ্রেণিকরণ করতে হয়েছে। এসব কারণ সম্মিলিতভাবে পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলেছে। তবে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো অর্থনীতির সামগ্রিক ধীরগতির প্রবৃদ্ধি।

তাহলে সমাধান কোথায়?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া কোনো পথ নেই। খেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা, সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন।

পাগলা ঘোড়া থামাতে হলে লাগাম ধরতে হবে শিকড়ে।