সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

বিদ্যুতের দাম বাড়ল রেকর্ড পরিমাণ: মাশুল দিচ্ছে সাধারণ মানুষ, দায় অতীতের ভুলের

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৪ জুন ২০২৬ | ৯:২০ পূর্বাহ্ন


এপ্রিলে বাড়ল ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও এলপিজির দাম।

এবার বিদ্যুৎ।

গতকাল বুধবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ঘোষণা দিল—আবাসিক থেকে শিল্প, কৃষি থেকে হাসপাতাল, মসজিদ থেকে মন্দির—সব ধরনের গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম বাড়ছে। গড়ে প্রায় বিশ শতাংশ। এটি দেশের ইতিহাসে একবারে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ মূল্যবৃদ্ধি।

গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম ইউনিটপ্রতি ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে হলো ১০ টাকা ৬৩ পয়সা। বৃদ্ধি ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। পাইকারি দাম বাড়ল আরও বেশি—৭ টাকা থেকে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা। বৃদ্ধি ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ।

এই মাস থেকেই কার্যকর।

প্রতিশ্রুতি ছিল, তারপরও বাড়ল

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ঘোষণা দিয়েছিলেন—আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না।

কিন্তু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে পড়লে সরকার সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে। দায়িত্ব নেওয়ার একশো দিনের মধ্যেই লাইনের গ্যাস ছাড়া সব ধরনের জ্বালানির দাম বেড়েছে কয়েক দফায়। এবার বিদ্যুতের পালা।

বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে বললেন, “সরকারের কোনো চাপ ছিল না।” সরকার ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব পেলেও কমিশন সব পক্ষের মতামত বিবেচনা করে গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আপনার বিল কতটা বাড়বে

সংখ্যাগুলো দেখলে বোঝা যায়, কোনো গ্রাহকই রেহাই পাননি।

যিনি সারাদিন মাত্র একটি বাল্ব আর একটি পাখা চালান—তিনিও আগামী মাসে প্রায় ৪০ টাকা বেশি দেবেন।

যিনি মাসে ৭৫ ইউনিট ব্যবহার করেন—বাড়তি দেবেন প্রায় ৬৯ টাকা।

যিনি ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ব্যবহার করেন—বাড়বে প্রায় ২০০ টাকার বেশি।

যিনি ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট ব্যবহার করেন—বাড়বে প্রায় ৪৫০ টাকা।

যিনি ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট ব্যবহার করেন—বাড়বে প্রায় ৬৪০ টাকা।

যিনি ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট ব্যবহার করেন—বাড়বে প্রায় ৯০০ টাকা।

আর যিনি ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহার করেন—প্রতি ইউনিটে দিতে হবে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা, আগের চেয়ে ২ টাকা ৭৪ পয়সা বেশি।

এর সাথে আনুপাতিক হারে বাড়বে ভ্যাট ও ট্যাক্স।

গরিবও রেহাই পায়নি

দেশের সবচেয়ে প্রান্তিক গ্রাহক—যারা মাসে মাত্র শূন্য থেকে পঞ্চাশ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাদের বলা হয় ‘লাইফ লাইন’ গ্রাহক। সারাদেশে এই শ্রেণিতে আছেন এক কোটি আটাত্তর লাখের বেশি গ্রাহক। তাদের মধ্যে এক কোটি একষট্টি লাখই পল্লী বিদ্যুতের গ্রামীণ গ্রাহক।

এই দরিদ্রতম গ্রাহকদের বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। ইউনিটপ্রতি দাম হয়েছে ৫ টাকা ৩২ পয়সা। পঞ্চাশ ইউনিট ব্যবহারকারী একজন গ্রাহকের মাসিক বিল বাড়বে ৩৭ টাকা।

বিইআরসি চেয়ারম্যান বললেন, “সব শ্রেণির মধ্যে লাইফ লাইন গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে কম হারে দাম বাড়ানো হয়েছে।”

কিন্তু যার মাসিক আয় চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা, তার জন্য ৩৭ টাকাও কম নয়।

কৃষি, শিক্ষা, ধর্ম—সবখানে আঘাত

কৃষি সেচে বিদ্যুতের দাম বাড়ল ১৫ শতাংশ—৫ টাকা ২৫ পয়সা থেকে ৬ টাকা ৪ পয়সায়। সেচের খরচ বাড়লে চাষের খরচ বাড়বে। চাষের খরচ বাড়লে বাড়বে চালের দাম।

স্কুল, মসজিদ, মন্দির, হাসপাতালে বিদ্যুতের দাম বাড়ল প্রায় ২০ শতাংশ। যে হাসপাতাল দরিদ্র রোগীদের সেবা দেয়, তার বিদ্যুৎ বিল বাড়লে সেবার মান বা খরচে প্রভাব পড়বে।

বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে দাম বাড়ল ১৮ শতাংশ। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ১৮ থেকে ১৯ শতাংশ। নির্মাণ খাতে ইউনিটপ্রতি দাম ১৫ টাকা ১৫ পয়সা থেকে লাফ দিয়ে হলো ১৯ টাকা ৯ পয়সা।

বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জিং স্টেশনেও দাম বাড়ল ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ।

দাম বৃদ্ধির পরোক্ষ প্রভাব

বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রভাব কেবল বিদ্যুৎ বিলে সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিল্প কারখানার উৎপাদন খরচ বাড়বে। পরিবহন খরচ বাড়বে। ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ বাড়বে। এর চূড়ান্ত ভার বহন করবেন সাধারণ ভোক্তা।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বলেন, “অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম-দুর্নীতি, সিস্টেম লস এবং ক্যাপাসিটি চার্জের মতো বিষয়গুলোর কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সেগুলো বন্ধের দাবি করা হলেও ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র গ্রাহকদের ওপর বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হলো।”

বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বললেন আরও সরাসরি: “বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি, অপচয় ও অব্যবস্থাপনার দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”

ক্যাপাসিটি চার্জ: যে ফাঁদে পড়েছে দেশ

বিদ্যুতের দাম বারবার কেন বাড়ছে—এর মূল উত্তর লুকিয়ে আছে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ নামের এক বিষফোঁড়ায়।

বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও কেন্দ্রগুলোকে ‘অলস’ বসিয়ে রেখে ভাড়া দিতে হয়। ২০১১-১২ অর্থবছরে এই ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল পাঁচ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা পৌঁছে গেছে ৪৫ হাজার ৪৫১ কোটি টাকায়। আগামী বছর হতে পারে ৫২ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা।

পনেরো বছরে বৃদ্ধি ৮৬৬ শতাংশ।

২০১১ সালে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল ২ টাকা ৩৫ পয়সা। এখন সেটি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ৫ টাকা ৪৬ পয়সা।

কারণ কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাস্তব চাহিদার চেয়ে বহু বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছিল। দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা এখন ১৮ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।

১১ হাজার মেগাওয়াটের উদ্বৃত্ত সক্ষমতা অলস বসে আছে। সেই অলস কেন্দ্রগুলোর ভাড়া দিতে হচ্ছে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা।

সেই টাকা আসছে কোথা থেকে? সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিল থেকে।

ভর্তুকি কমছে, কিন্তু সমস্যার সমাধান হচ্ছে না

দাম বাড়ানোর পর সরকারের বিদ্যুৎ ভর্তুকি ৫৬ হাজার কোটি থেকে কমে দাঁড়াবে ৪১ হাজার কোটি টাকায়। সরকার বাড়তি রাজস্ব পাবে ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।

ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা প্রতি বছর বাড়ছে। অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ না করলে এই ব্যয় কমবে না। আর যতদিন এই বোঝা থাকবে, ততদিন জনগণের কাঁধেই চাপানো হবে মাশুল।

দেশের বিদ্যুৎ খাতের সংকটের শিকড় গভীরে। অতীতের ভুল সিদ্ধান্ত, অপরিকল্পিত কেন্দ্র নির্মাণ, ক্যাপাসিটি চার্জের অসুস্থ ব্যবস্থা—এই সমস্যাগুলো সমাধান না করে শুধু দাম বাড়িয়ে সমাধান আসবে না।

কিন্তু সেই কঠিন সংস্কারের পথে না হেঁটে সহজ পথে হাঁটা হলো।

দাম বাড়িয়ে দাও। ভর্তুকি কমাও। বাজেটে স্বস্তি নাও।

আর হিসাবটা মেটাক সাধারণ মানুষ—যার ঘরে একটি বাল্ব আর একটি পাখা জ্বলে, সেই মানুষও।