সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

বাণিজ্যের নতুন লাইফলাইন, আনোয়ারা এখন ইতিহাসের মোড়ে

জিন্নাত আয়ুব | প্রকাশিতঃ ১২ জুন ২০২৬ | ৬:১৩ অপরাহ্ন


কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ে একটি উপজেলা। একসময় মানুষ চিনত কেবল নারকেল বাগান আর মৎস্যজীবীদের গ্রাম হিসেবে। সেই আনোয়ারা আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির এক নতুন কেন্দ্রবিন্দু। কর্ণফুলী টানেল এসেছে। কোরিয়ান ইপিজেড দাঁড়িয়ে গেছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের স্বপ্ন দিগন্তে উঁকি দিচ্ছে। আর এবার একনেকের সভায় অনুমোদন পেল সেই সড়ক, যা এই পুরো ছবিটাকে একসুতোয় গেঁথে দেবে।

আনোয়ারার কালাবিবির দিঘী মোড় থেকে বাঁশখালী, টইটং, পেকুয়া, বদরখালী হয়ে চকরিয়ার ঈদমনি পর্যন্ত- ৫৮ দশমিক ২০ কিলোমিটারের এই আঞ্চলিক মহাসড়ক এখন শুধু একটি রাস্তা নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি।

সংখ্যার ভেতরে লুকানো গল্প

প্রকল্পের হিসাব শুনলে চমকে যেতে হয়। ১ হাজার ১৮৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকার এই প্রকল্পে সড়কটি মাত্র সাড়ে পাঁচ মিটার থেকে বেড়ে হবে ১০ দশমিক ৩০ মিটার- প্রায় দ্বিগুণ। সময়সীমা ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত।

কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় গল্প হলো দূরত্বের হিসাব। এই সড়ক চালু হলে ঢাকা থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব কমবে ৫০ কিলোমিটার। চট্টগ্রাম বন্দর ও আনোয়ারার শিল্পাঞ্চল থেকে কক্সবাজার ও মাতারবাড়ী বন্দরের দূরত্ব কমবে ৩৫ কিলোমিটার।

৩৫ কিলোমিটার কম মানে ঘণ্টার পর ঘণ্টার যানজট থেকে মুক্তি। কম জ্বালানি। কম সময়। কম টাকা। কম ক্লান্তি।

যে রাস্তা তৈরি করবে করিডোর

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সড়কের আসল শক্তি লুকিয়ে আছে তার ভৌগোলিক অবস্থানে। কর্ণফুলী টানেলের আনোয়ারা প্রান্ত থেকে শুরু হওয়ায় ঢাকা বা চট্টগ্রাম শহর থেকে আসা পণ্যবাহী লরি পটিয়া ক্রসিংয়ের কুখ্যাত যানজট এড়িয়ে সরাসরি টানেল পেরিয়ে এই নতুন রুটে উঠতে পারবে। আনোয়ারার কোরিয়ান ইপিজেড (কেইপিজেড) এবং প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পণ্য পৌঁছে যাবে দ্রুত ও কম খরচে।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির বিশ্লেষণ বলছে, আনোয়ারা এখন আর একটি সাধারণ উপজেলা নয়- এটি এখন গ্লোবাল লজিস্টিকস হাব। আর এই মহাসড়ক হবে সেই হাবের প্রধান ধমনি।

কর্ণফুলী টানেল, কেইপিজেড, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং এই নতুন মহাসড়ক- চারটি মিলে তৈরি হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী বাণিজ্যিক করিডোর। আনোয়ারা-বাঁশখালীর এতদিনের অবহেলিত উপকূলীয় চরাঞ্চলে গড়ে উঠবে নতুন ভারী ও মাঝারি শিল্প। দশকের পর দশক যে জমিগুলো পড়ে ছিল, সেখানে জ্বলে উঠবে কারখানার আলো।

মাটির গল্প: যাদের জন্য এই রাস্তা

গত পনেরো বছর ধরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে গাড়ি চালাচ্ছেন বাস চালক জসিম উদ্দিন। তাঁর মুখে এই রুটের কষ্টের গল্প শুনলে বোঝা যায়, একটি ভালো রাস্তা মানুষের জীবনে আসলে কতটা বদলে দিতে পারে।

“চন্দনাইশ, পটিয়ার শান্তিরহাট আর দোহাজারী পার হওয়া মানেই একেকটা যুদ্ধ। কখনো কখনো জ্যামে জান শেষ হয়ে যায়।”- জসিম উদ্দিনের কণ্ঠে যন্ত্রণার ছাপ। তিনি বলেন, ২ থেকে ৩ ঘণ্টা সময় বাঁচা মানে ট্রিপ বেশি, তেল খরচ কম, চালকের ওপর মানসিক চাপ কম। তবে তাঁর একটাই আবেদন, “রাস্তা যেন টেকসই হয়। জোয়ারের পানি আর বর্ষার বৃষ্টিতে উপকূলের রাস্তা দ্রুত ভেঙে যায়।”

আনোয়ারার চাতরী চৌমুহনী বাজারের ব্যবসায়ী ও আমদানিকারক নাজিম উদ্দীন শাহ-এর কথায় উঠে আসে ব্যবসার বদলে যাওয়া ছবি। টানেল হওয়ার পর তাঁদের ব্যবসার পরিধি বেড়েছে। কিন্তু চকরিয়া বা কক্সবাজারে পণ্য পাঠাতে হলে এখনো পটিয়া ঘুরে যেতে হয়। “এই নতুন মহাসড়ক চালু হলে আমাদের পণ্য পরিবহনের খরচ ও সময় দুই-ই প্রায় অর্ধেক কমে আসবে।”

তবে তিনি সতর্কও করলেন। কালাবিবির দিঘী মোড় বা চাতরী চৌমুহনীর ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় অনেক ছোট-বড় ব্যবসায়ী জমি হারাবেন। সঠিক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন না হলে উন্নয়নের আনন্দ হয়ে উঠতে পারে অনেকের জন্য বেদনার কারণ।

চ্যালেঞ্জের কথাও বলতে হবে

স্বপ্নের পাশাপাশি বাস্তবের কথাও বলা দরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কের দু’পাশে ৩৫ ফুট করে মোট ৭০ ফুট জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় শত শত স্থাপনা ও দোকান উচ্ছেদের প্রক্রিয়া হবে জটিল। বৈদ্যুতিক পোল, গ্যাস ও ইন্টারনেট লাইন সরাতে দেরি হলে কাজ আটকে যাবে। আর উপকূলের বর্ষামৌসুমে জোয়ারের পানি নির্মাণকাজকে প্রতিবছরই পিছিয়ে দিতে পারে।

চট্টগ্রাম চেম্বার তাই শুরু থেকেই কঠোর মনিটরিং চাইছে- যাতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এই লাইফলাইন মাঝপথে আটকে না যায়।

ইতিহাসের মোড়ে আনোয়ারা

চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম বললেন, “এই সড়কটি কেবল পিচঢালা কোনো রাস্তা নয়, এটি আনোয়ারার তথা পুরো দেশের অর্থনীতির ভাগ্য পরিবর্তনের প্রধান অর্থনৈতিক করিডোর।”

কথাটি অতিরঞ্জন নয়। যে আনোয়ারা একসময় মানচিত্রে ছিল প্রান্তিক, সেই আনোয়ারা এখন ইতিহাসের মোড়ে দাঁড়িয়ে। টানেল, ইপিজেড, মহাসড়ক, গভীর সমুদ্রবন্দর- সব মিলিয়ে এই উপজেলা হয়ে উঠছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বাণিজ্যিক হাব।

এখন প্রশ্ন একটাই- এই স্বপ্নকে সত্যি করার মতো সদিচ্ছা ও দক্ষতা কি থাকবে বাস্তবায়নকারীদের?