সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

স্কুলবাস বদলে দিতে পারে শহরের ভাগ্য

নজরুল কবির দীপু | প্রকাশিতঃ ১২ জুন ২০২৬ | ১০:৩২ অপরাহ্ন


প্রতিদিন সকাল আটটায় চট্টগ্রাম বা ঢাকার যেকোনো আবাসিক এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকলে একটাই দৃশ্য চোখে পড়বে- সরু গলি থেকে ব্যস্ত মহাসড়ক পর্যন্ত হাজারো স্কুলপড়ুয়ার ভিড়। কেউ অটোরিকশায়, কেউ রিকশায়, কেউ বা বাবা-মায়ের মোটরসাইকেলের পেছনে কোনোমতে ঝুলে। অভিভাবকদের মুখে উদ্বেগ, রাস্তায় বিশৃঙ্খলা। এই ছবিটা শুধু একটি পরিবারের নয়- এটি আমাদের শহরগুলোর প্রতিদিনকার যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি।

এই যন্ত্রণার একটি বড় অংশ সমাধান করতে পারে একটিমাত্র উদ্যোগ- সমন্বিত স্কুলবাস সার্ভিস।

যানজট শুধু বিরক্তি নয়, এটি জাতীয় সংকট

আমরা যখন যানজটকে কেবল ‘রাস্তার ঝামেলা’ ভাবি, তখন আসলে একটি বিশাল অর্থনৈতিক বিপর্যয়কে অবহেলা করি। বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) ও বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার যানজটের কারণে বছরে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা বা ৬.৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। উৎপাদনশীলতা হ্রাস, অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়, পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি- সব মিলিয়ে এই ক্ষতি তৈরি হয়।

আরও উদ্বেগজনক হলো, ঢাকার যানজটে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। যানবাহনের গড় গতি নেমে এসেছে ঘণ্টায় মাত্র ৫ থেকে ৭ কিলোমিটারে, যা অনেক সময় হাঁটার গতির কাছাকাছি।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্য বলছে, যানজটের কারণে প্রতিদিন প্রায় ১৪০ কোটি টাকার কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার যানজট একাই জাতীয় জিডিপির প্রায় ২.৯ শতাংশ ক্ষতির জন্য দায়ী। পরোক্ষ ক্ষতি ধরলে এই হার ৬ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

এই ক্ষতির পেছনে বহু কারণ থাকলেও স্কুল শুরুর ও ছুটির সময়ের যানচাপ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ। প্রতিদিন হাজারো অভিভাবক সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিতে ও ফিরিয়ে আনতে ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহার করেন। ফলে দিনের নির্দিষ্ট কয়েক ঘণ্টায় সড়কে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়, যা পুরো নগরীর যানবাহন চলাচলকে প্রভাবিত করে।

চট্টগ্রাম দেখাচ্ছে পথ

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন হলো- এর কোনো কার্যকর সমাধান কি সম্ভব? সুখের বিষয়, সেই সমাধানের একটি পরীক্ষিত মডেল ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম দেখাতে শুরু করেছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, স্মার্ট স্কুলবাস সেবা চালুর পর প্রথম এক বছরের মধ্যেই তিন হাজারের বেশি শিক্ষার্থী নিয়মিত এই সেবা ব্যবহার করেছে। জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়েছে যে অভিভাবকদের দাবির মুখে আরও বাস যুক্ত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়।

প্রতিটি বাসে ৭৮ জন শিক্ষার্থী যাতায়াত করতে পারবে। জিপিএস ট্র্যাকিং, আইপি ক্যামেরা, রিয়েল-টাইম লোকেশন সুবিধা এবং স্মার্ট কার্ড পাঞ্চিং- শিক্ষার্থী বাসে উঠলেই অভিভাবকের ফোনে স্বয়ংক্রিয় বার্তা।

চট্টগ্রামের এই উদ্যোগটি শুধু বাংলাদেশের প্রথম স্মার্ট স্কুলবাস প্রকল্পই নয়, এটি ‘স্মার্ট ডিস্ট্রিক্ট ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ’-এও স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য ছিল যানজট কমানো, সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি হ্রাস এবং অভিভাবকদের পরিবহন-সংক্রান্ত ভোগান্তি কমানো।

এর পাশাপাশি চট্টগ্রামেই গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম উদ্ভাবনী স্টার্টআপ ‘পিউপিল স্কুল বাস লিমিটেড’। ২০২৩ সালে মাত্র দুটি মাইক্রোবাস ও ৫০ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠান এখন চট্টগ্রাম ও ঢাকা মিলিয়ে প্রায় ৬ হাজার শিক্ষার্থী পরিবহন করছে। অ্যাপের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং, লাইভ ভিডিও ফিড এবং প্রশিক্ষিত নারী গাইড- ছোট শিশুদের নিরাপদে ওঠানামার ব্যবস্থা। প্রতিষ্ঠাতা আবদুর রশীদ সোহাগ বলছেন, শুধু ঢাকায়ই কাল থেকে আরও ২০টি মাইক্রোবাস নামাতে পারেন, যদি সম্পদ থাকে।

চীনের মডেল, বাংলাদেশের সুযোগ

চট্টগ্রামের অভিজ্ঞতা দেখায় যে উদ্যোগটি বাস্তবে কার্যকর হতে পারে। আর বিশ্বের অন্যান্য দেশ প্রমাণ করেছে, বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়ন করলে এর সুফল আরও অনেক বেশি।

পৃথিবীতে এই ধারণা নতুন নয়। চীনের জিয়াংনিং জেলায় ৩১২টি স্কুলবাস ২৭২টি রুটে চলে এবং ৩৪টি স্কুলের সব শিক্ষার্থী এই সেবার আওতায়। একই ডিজাইনের বাস, কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা, নির্দিষ্ট স্টপেজ- পুরো শহরের শিক্ষার্থী পরিবহন একটি শৃঙ্খলায় আনা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ শিক্ষার্থী স্কুলবাসে যাতায়াত করে। দেশটির পরিবহন নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, স্কুলবাসে ভ্রমণ ব্যক্তিগত গাড়ির তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ। ফলে স্কুলবাস শুধু যানজট নয়, শিশুদের সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো- স্কুল পরিবহনকে আলাদা কোনো প্রতিষ্ঠানের সেবা হিসেবে নয়, বরং নগর পরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা।

বাংলাদেশে চট্টগ্রাম ও ঢাকার মতো বড় শহরকে কয়েকটি জোনে ভাগ করে এমন সার্ভিস চালু করা সম্ভব।

ধরা যাক, একটি ৭৮ আসনের স্কুলবাস মাত্র ৫০টি মোটরসাইকেল এবং ২০টি ব্যক্তিগত গাড়ির বিকল্প হিসেবেও কাজ করে। তাহলে মাত্র ১০টি বাসই প্রতিদিন কয়েকশ যানবাহন সড়ক থেকে সরিয়ে দিতে পারে। বড় শহরে শত শত স্কুলবাস চালু হলে এর প্রভাব হবে বহুগুণ বড়।

আবার যানজট শুধু সময় নষ্ট করে না, এটি বায়ুদূষণেরও বড় উৎস। দীর্ঘ সময় ইঞ্জিন চালু থাকা ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল থেকে বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হয়। একটি স্কুলবাসে ৫০-৭০ জন শিক্ষার্থী পরিবহন করা গেলে একই সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য ব্যবহৃত কয়েক ডজন মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির প্রয়োজন কমে যায়। ফলে জ্বালানি সাশ্রয় এবং কার্বন নিঃসরণ- দুটোই কমে।

তবে এটি শুধু বেসরকারি উদ্যোগের ওপর ছেড়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং পরিবহন কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

তাই প্রতিটি জোনে স্কুলের প্রতিনিধি, সিটি করপোরেশন এবং পুলিশের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা যায়। কেন্দ্রীয় অনলাইন ডিজিটাল পাসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সার্ভিস ব্যবহার করবে। স্কুল বন্ধের দিনে এই বাসগুলো গণপরিবহন হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে, যা লম্বা ছুটিতে যানবাহনের সংকট কমাবে।

পিউপিল ইতোমধ্যে ২০২৬ সালের মধ্যে পালকি মোটরসের সাথে ইলেকট্রিক স্কুলবাস আনার পরিকল্পনা করছে। এয়ার কন্ডিশনিং ও অ্যাপ-সুবিধাসহ সেই বাসের ভাড়া হবে বর্তমানের চেয়ে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কম।

সদিচ্ছাই পারে বদলে দিতে

একটি শিশু যখন নিরাপদে স্কুলে পৌঁছায়, তখন কেবল একটি পরিবার স্বস্তি পায় না- পুরো শহর একটু নিঃশ্বাস নেয়। একটি সমন্বিত স্কুলবাস সার্ভিস মানে শুধু যানজট কমানো নয়- এটি শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা, অভিভাবকের কর্মঘণ্টা রক্ষা, জ্বালানি সাশ্রয় এবং পরিবেশ দূষণ হ্রাস- সব একসাথে।

যে দেশে প্রতিদিন যানজটে কোটি কোটি টাকার উৎপাদনশীলতা হারিয়ে যায়, সেখানে স্কুলবাসকে শুধু শিক্ষা-সহায়ক সেবা হিসেবে নয়, অর্থনৈতিক ও নগর ব্যবস্থাপনার একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবেও দেখা উচিত।

চট্টগ্রাম ইতোমধ্যে পথ দেখিয়েছে। দরকার শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সঠিক বিনিয়োগ আর টেকসই পরিকল্পনা। নইলে প্রতিদিন সকালে সেই একই দৃশ্য- বিশৃঙ্খল সড়কে লাখো শিশু, লাখো উদ্বিগ্ন অভিভাবক, আর থেমে থাকা শহর।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।