সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

পরিচয়পত্র দেখালেন, তবু থামল না লাঠি

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১৩ জুন ২০২৬ | ১১:৫৬ পূর্বাহ্ন


রাত তখন সাড়ে দশটা। চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দর থেকে একটি সিএনজি ছেড়ে দিল। ভেতরে বসা যাত্রী ক্লান্ত, কিন্তু মনে স্বস্তি- ঢাকায় প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ শেষ, এখন শুধু বাড়ি ফেরা। সেই যাত্রী বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অফ স্পিনার নাঈম হাসান।

এক্সপ্রেসওয়ে পেরিয়ে লালখান বাজার মোড়ে পৌঁছাতেই সিএনজি থামার সংকেত পেল। এরপর যা ঘটল, তা কোনো চলচ্চিত্রের দৃশ্য নয়- এটি বাস্তব। এবং এই বাস্তবতা প্রশ্ন তুলে দিয়েছে দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার গভীরে।

থামল সিএনজি, শুরু হলো দুঃস্বপ্ন

কয়েকজন ডিবি পুলিশ পরিচয়ে এগিয়ে এলেন। চালকের কাছ থেকে কাগজপত্র নিলেন। তারপর নাঈমকে নামতে বললেন। নাঈম নামলেন। সহযোগিতার হাত বাড়ালেন।

কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গেল। গলায় ধাক্কা দিয়ে তাঁকে পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা শুরু হলো। নাঈম নিজের পরিচয় দিলেন। পরিচয়পত্র বের করে দেখালেন। কিন্তু থামল না কিছুই।

নাঈম নিজেই বর্ণনা করলেন সেই মুহূর্ত: “থামাতেই কয়েকজন ডিবি পুলিশ পরিচয়ে এসে আমাকে গলায় ধাক্কা দিয়ে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করে। আমি পরিচয়পত্র দেখালেও খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম হাতে থাকা লাঠি দিয়ে কোমরে আঘাত করতে থাকেন।”

সঙ্গে ছিলেন সাদা পোশাকের আরেকজন- পুলিশের সোর্স সোহেল। তাঁর হাতে ছিল পাইপ। সেই পাইপও চলল নাঈমের শরীরে।

ততক্ষণে ঘটনাস্থলে জড়ো হয়েছেন একশ থেকে দুইশ মানুষ। অনেকে চিনতে পেরে চিৎকার করে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করলেন। জবাব এলো একটাই- “তুই আসামি, চুপ থাক, একটা কথাও বলবি না।”

একপর্যায়ে আরেকটি অটোরিকশায় তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হলো। শেষমেশ খুলশী থানায় নেওয়া হলো তাঁকে।

থানায় গিয়েও মিলল না সম্মান

থানায় নেওয়ার পরও দুর্ভোগ শেষ হলো না। ওসির কক্ষে নেওয়া হলো নাঈমকে। তিনি ঘটনার বিস্তারিত জানাতে চাইলেন। ওসি বারবার বললেন, “চোখ নিচু করে কথা বলো।”

তখনো নাঈমের হাতে ফোন নেই। লালখান বাজার থেকেই ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।

একটু পরে ওসির ফোনে একটি কল এলো। কণ্ঠস্বর বদলে গেল। ঘরের পরিবেশ পাল্টাল।

থানায় ফোন ফিরে পেয়ে নাঈম প্রথমেই কল করলেন বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালকে। তামিম জানালেন বিসিবির সদস্য ইসরাফিল খসরুকে। এরপর থেকে একের পর এক ফোন যেতে লাগল থানায়। তখনই নড়েচড়ে বসল কর্তৃপক্ষ।

পেছনে যে গল্প

পুলিশ সূত্র বলছে, ঘটনার শিকড় আরও গভীরে। খুলশী থানার এসআই মনিরুল ইসলাম তখন ঢাকায় ছুটিতে। তিনি সহকর্মী এসআই শফিকুলকে একটি তথ্য দিয়েছিলেন- একটি সিএনজিতে করে সোনার চোরাচালান আসবে। তথ্যটি নাকি এসেছিল একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে।

সেই অযাচাই তথ্যের ভিত্তিতে অভিযানে নেমেছিলেন শফিকুল। না জানিয়েছিলেন থানার ওসিকে, না মেনেছিলেন অভিযানের নিয়মকানুন।

নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম বললেন, “অভিযান চালানোর নিয়ম রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, আপাতদৃষ্টিতে এখানে ভুলত্রুটি রয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনা হবে।”

মামলা, ক্লোজড, তবু প্রশ্ন থাকে

শনিবার সকালে নাঈমের ভাই সাব্বির আলম থানায় মামলা করলেন। আসামি করা হলো এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল এবং পুলিশ সোর্স সোহেলকে। অভিযোগ— মারধর ও অপহরণ চেষ্টা। এসআই শফিকুলসহ দুই কনস্টেবলকে তাৎক্ষণিক ক্লোজড করে পুলিশ লাইনসে পাঠানো হয়েছে।

কোয়াব আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সংগঠনটি পরিষ্কার বলেছে, এ ধরনের আচরণ কেবল একজন ক্রিকেটারের জন্য নয়, দেশের যেকোনো নাগরিকের ক্ষেত্রেই অগ্রহণযোগ্য।

নাঈমের বাবা মাহবুবুল আলমও খালি হাতে থানা থেকে ফেরেননি। তিনি জানালেন, থানায় এলে ডিউটি অফিসারও তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন।

যে কথাটি ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না

হাসপাতাল থেকে মেডিকেল রিপোর্ট নিয়ে ফেরার পর নাঈম হাসান একটি কথা বললেন যা সবচেয়ে বেশি মনে রাখার মতো।

“আজকে আমার সঙ্গে হয়েছে। আমার জন্য অনেক লোক এসেছে থানায়। কিন্তু অন্য সাধারণ লোকের জন্য কেউ থানায় আসবে না।”

এই একটি বাক্যে নাঈম শুধু নিজের কথা বলেননি। বলেছেন সেই লাখো মানুষের কথা, যাদের পাশে তামিম ইকবাল নেই, ইসরাফিল খসরু নেই, কোয়াব নেই। যাদের একমাত্র পরিচয়- তারা সাধারণ নাগরিক।

এসআই ক্লোজড হয়েছেন। মামলা হয়েছে। তদন্ত চলছে। কিন্তু আসল প্রশ্নটির উত্তর এখনো মেলেনি- পরিচয়পত্র দেখানোর পরও যে হাত থামে না, সেই হাত কবে থামবে?