সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

আট হাজার প্রাণের আস্থা, তবু অপূর্ণ একটি ট্রমা সেন্টার

মোহাম্মদ আলাউদ্দিন | প্রকাশিতঃ ১৪ জুন ২০২৬ | ১১:২৪ অপরাহ্ন


চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক। দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই সড়কে প্রতিদিন ছুটে চলে হাজারো যানবাহন। পণ্যবাহী ট্রাক, যাত্রীবাহী বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি- বিরামহীন এই চলাচলের সাথে পাল্লা দিয়ে চলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। রাতের আঁধারে হঠাৎ সংঘর্ষ, বাঁকে উল্টে যাওয়া বাস- এমন দুর্ঘটনার পর আহত মানুষটির জন্য প্রতিটি মিনিট হয়ে ওঠে মূল্যবান।

সেই মুহূর্তে লোহাগাড়া ট্রমা সেন্টার এখন একটি আশার নাম।

আগে যা হতো

ট্রমা সেন্টার চালু হওয়ার আগের দিনগুলোর কথা মনে করলে এলাকাবাসীর চোখে এখনো উদ্বেগ ফুটে ওঠে। দুর্ঘটনায় আহত হলে রোগীকে নিয়ে ছুটতে হতো চট্টগ্রাম শহর কিংবা কক্সবাজার। দীর্ঘ পথ, যানজট, সময়ের অপচয়- অনেক সময় সেই দেরিটাই হয়ে উঠত প্রাণঘাতী। যে আঘাত সময়মতো চিকিৎসা পেলে সারত, সেটাই পরিণত হতো স্থায়ী পঙ্গুত্বে। যে রোগী বাঁচতে পারত, সে আর ফিরত না।

সেই বেদনার অধ্যায় বদলে দিতেই লোহাগাড়ায় যাত্রা শুরু হয়েছিল এই ট্রমা সেন্টারের।

আট হাজারের গল্প

সংখ্যাটা ছোট নয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় আট হাজার রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন এই সেন্টারে। শুধু চলতি বছরের মে মাসেই সেবা নিয়েছেন এক হাজারেরও বেশি আহত রোগী।

প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটি করে মানুষ। একটি করে পরিবার। একটি করে রক্ষা পাওয়া জীবন।

চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইনের আন্তরিক উদ্যোগে এই সেন্টারের কার্যক্রম চালু হয়েছিল। সেই উদ্যোগ আজ হাজারো মানুষের জীবনে পরিবর্তন এনেছে।

সীমিত সম্পদে অসীম সেবা

২০ শয্যার এই ট্রমা সেন্টারে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জুনিয়র কনসালটেন্ট (অর্থোপেডিক) ডা. তাসফিক আহমেদ এবং কনসালটেন্ট (সার্জারি) ডা. মোবাশ্বেরুল আমিন রাজিব। স্বল্প সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স, আয়া ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়েই চলছে সার্বক্ষণিক সেবা। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা জরুরি চিকিৎসা চালু আছে। যেকোনো সংকটে প্রস্তুত রয়েছে অ্যাম্বুলেন্স।

মহাসড়কের ঠিক পাশেই অবস্থান হওয়ায় দুর্ঘটনার পর অল্প সময়ের মধ্যেই রোগীকে নিয়ে আসা যাচ্ছে। প্রাথমিক চিকিৎসা মিলছে দ্রুত। মৃত্যুঝুঁকি কমছে, কমছে স্থায়ী পঙ্গুত্বের আশঙ্কাও।

ডা. মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন বলছেন, “মানবিক সেবা, দক্ষ চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার কারণে লোহাগাড়া ট্রমা সেন্টার ইতোমধ্যে আহত রোগীদের জন্য আশার আলো হয়ে উঠেছে।”

যা এখনো বাকি

কিন্তু স্বস্তির এই ছবির পেছনেও আছে অপ্রাপ্তির আক্ষেপ। সেন্টারটি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। জনবল সীমিত। আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি আছে। রোগীর সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে, কিন্তু সক্ষমতা সেই তুলনায় বাড়েনি।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, এই একটি ট্রমা সেন্টার পূর্ণাঙ্গ হলে লাভবান হবেন শুধু লোহাগাড়ার মানুষ নন- সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, দোহাজারী এবং কক্সবাজারমুখী লাখো মানুষও উপকৃত হবেন।

এলাকাবাসীর কণ্ঠে একটাই দাবি- “সীমিত জনবল নিয়ে এখন যেভাবে সেবা দেওয়া হচ্ছে, তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এই সেন্টারকে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালসদৃশ সেবাকেন্দ্রে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি।”

এখনই সময়

আট হাজার রোগী সেবা নিয়েছেন- এই সংখ্যাটাই প্রমাণ করে, লোহাগাড়া ট্রমা সেন্টার কতটা প্রয়োজনীয়। যে প্রত্যয় নিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল- দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দিয়ে জীবন বাঁচানো- সেই লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি পূরণ হয়নি।

প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, আধুনিক সরঞ্জাম আর পর্যাপ্ত অবকাঠামো নিশ্চিত হলে এই সেন্টার হয়ে উঠতে পারে দক্ষিণ চট্টগ্রামের জরুরি স্বাস্থ্যসেবার প্রধান ভরসাস্থল। সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব এখন সরকারের।

মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই ছোট্ট সেন্টারটি প্রতিদিন নীরবে বলে যাচ্ছে- একটু সম্পদ, একটু মনোযোগ দিলেই বাঁচানো যায় অনেক মূল্যবান প্রাণ।