
চট্টগ্রামের আদালতকক্ষটি বুধবার ছিল অস্বাভাবিক নীরব। বিচারকের কণ্ঠে যখন রায় উচ্চারিত হচ্ছিল, তখন প্রায় আড়াই বছর ধরে বয়ে চলা এক পরিবারের বেদনা, অপেক্ষা আর ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা যেন এক বিন্দুতে এসে মিলিত হচ্ছিল।
পাঁচ বছর বয়সী আলিনা ইসলাম আয়াত। ২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর বিকেলে ঘরের পাশের মসজিদে আরবি পড়তে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়েছিল সে। পরিবারের কাছে সেটি ছিল একটি সাধারণ বিকেল। কেউ জানত না, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই বিকেল পরিণত হবে দেশের অন্যতম আলোচিত এক অপরাধকাহিনিতে।
বুধবার (১৭ জুন) চট্টগ্রামের ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মুহাম্মদ আলী আক্কাস এই বহুল আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করেন। আদালত একমাত্র আসামি আবীর আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পাশাপাশি এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
একটি নিখোঁজের ঘটনা থেকে জাতির আলোড়ন
ঘটনার দিন বিকেলে আয়াত নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবার ও স্বজনরা তাকে খুঁজতে শুরু করেন। প্রথমে এটি একটি নিখোঁজ শিশুর ঘটনা হিসেবেই দেখা হচ্ছিল। কিন্তু তদন্ত যত এগিয়েছে, ততই বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ সত্য।
তদন্তে উঠে আসে, মুক্তিপণের উদ্দেশ্যে প্রতিবেশী আবীর আলী শিশুটিকে অপহরণ করেছিলেন। কিন্তু তাকে কোথাও লুকিয়ে রাখার সুযোগ না পেয়ে হত্যা করা হয়। পরে মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনাও ছিল বলে তদন্তে জানা যায়।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্তের বিভিন্ন ধাপে গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করে। আবীরের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, ডিএনএ পরীক্ষার ফল, আলামত উদ্ধার এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ মামলাটিকে শক্ত ভিত্তি দেয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি জালাল উদ্দিন জানান, আদালত পর্যবেক্ষণে ঘটনাটিকে পূর্বপরিকল্পিত, নিষ্ঠুর, নৃশংস ও সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আদালত মনে করেছেন, আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। বিচারিক কার্যক্রমে রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে ৩৩ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের জবানবন্দি, সুরতহাল প্রতিবেদন, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট, উদ্ধারকৃত আলামত এবং অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করে আদালত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
তদন্ত থেকে বিচার
ঘটনার পর আয়াতের বাবা ইপিজেড থানায় মামলা দায়ের করেন।
তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ৯ অক্টোবর পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পরিদর্শক মনোজ কুমার দে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। অভিযোগপত্রে আবীর আলীকে একমাত্র আসামি করা হয়। তার বাবা-মা ও বোনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।
এ ছাড়া ঘটনা জেনেও গোপন রাখার অভিযোগে এক কিশোরের বিরুদ্ধে পৃথক দোষীপত্র দেওয়া হয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তার বিচার শিশু আদালতে চলমান রয়েছে।
দীর্ঘ তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে এ মামলার রায় ঘোষণা হলো।
একটি রায়ের বাইরেও
এই মামলার রায় শুধু একজন আসামির শাস্তি নির্ধারণ নয়; এটি এমন এক ঘটনার বিচার, যা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
একটি শিশুর নিরাপত্তা, সমাজে অপরাধের ভয়াবহতা এবং দ্রুত ও কার্যকর তদন্তের গুরুত্ব- সবকিছুই নতুন করে সামনে এনেছিল আয়াত হত্যাকাণ্ড।
আদালতের রায়ের মধ্য দিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার একটি অধ্যায় শেষ হলো। কিন্তু যে পরিবার তাদের শিশুকে হারিয়েছে, তাদের শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়।
তবু ন্যায়বিচারের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বুধবারের এই রায় হয়তো তাদের জন্য অন্তত একটি বার্তা বহন করে-অপরাধ যত ভয়াবহই হোক, আইনের বিচার একদিন না একদিন পৌঁছে যায় তার গন্তব্যে।